Sun. Mar 22nd, 2026

‘সিপিএম-কংগ্রেসকে মুছে দিয়েছি, এবার বিজেপির পালা!’—বীরভূমে কেষ্টর হুঙ্কারে তুঙ্গে ভোটের উত্তাপ

বীরভূমের রাজনৈতিক ময়দান আবারও তপ্ত, আর সেই উত্তাপের কেন্দ্রে তৃণমূলের দাপুটে নেতা অনুব্রত মন্ডল-যিনি ‘কেষ্ট’ নামেই বেশি পরিচিত৷ ভোট যত এগোচ্ছে, ততই তাঁর আগ্রাসী সুর, আত্মবিশ্বাসী বার্তা এবং চ্যালেঞ্জে সরগরম হয়ে উঠছে জেলা রাজনীতি৷ স্পষ্ট ভাষায় তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, একসময় যেমন কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (Marxist) (সিপিএম) এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস-কে বীরভূমের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে প্রায় মুছে ফেলা হয়েছে, ঠিক একই পরিণতি অপেক্ষা করছে ভারতীয় জনতা পার্টি-র জন্যও৷ এই বক্তব্য ঘিরেই তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তরজা, যা এখন ভোটের প্রচারে অন্যতম বড় ইসু্য৷

প্রথমত, অনুব্রত মণ্ডলের বক্তব্যে উঠে এসেছে তাঁর ব্যক্তিগত লড়াই এবং দলের প্রতি অটুট আনুগত্যের গল্প৷ তাঁর দাবি, বিজেপির তরফে একাধিকবার তাঁকে দলে টানার চেষ্টা হয়েছে, কিন্ত্ত তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন৷ শুধু তাই নয়, এই সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি৷ তাঁর মেয়ে সুকন্যা মণ্ডলের জেলযাত্রার প্রসঙ্গ তুলে তিনি আবেগঘন বার্তা দেন-যা ভোটারদের মধ্যে সহানুভূতির সুর তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে৷ এই আবেগ, রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে মিশে তৈরি করছে এক শক্তিশালী প্রচার-ন্যারেটিভ৷

দ্বিতীয়ত, সংগঠনের শক্তি নিয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস নজরকাড়া৷ প্রায় আড়াই বছর জেলবন্দি থাকার পরেও বীরভূমে তৃণমূলের সংগঠনে কোনও ভাঙন ধরেনি-এই দাবিই তিনি বারবার তুলে ধরছেন৷ তাঁর কথায়, ‘আমাকে বন্দি রেখেও সংগঠন ভাঙতে পারেনি কেউ’-এই বার্তা সরাসরি বিরোধীদের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুঁডে় দেয়৷ গত লোকসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের উদাহরণ টেনে তিনি বোঝাতে চাইছেন, দলের ভিত্তি এখনও অটুট এবং জনসমর্থন দৃঢ়৷

তৃতীয়ত, আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে তাঁর লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট-বীরভূমের ১১টি বিধানসভা আসনেই জয়৷ ২০২১ সালের নির্বাচনে দুবরাজপুর আসন হারানোর কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, সেটা ছিল দলের নিজেদের ভুলের ফল৷ তবে এবার সেই ভুল আর হবে না বলেই আত্মবিশ্বাসী তিনি৷ প্রতিটি কেন্দ্রে নিজে গিয়ে প্রচার করবেন, জনসংযোগ বাড়াবেন, এমনকি দলীয় প্রার্থীদের পাশে দাঁডি়য়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করবেন-এই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন৷

চতুর্থত, তাঁর বিখ্যাত ‘খেলা হবে’ স্লোগান আবারও রাজনৈতিক ময়দানে গর্জে উঠেছে৷ এই স্লোগান শুধু একটি বাক্য নয়, বরং তৃণমূলের নির্বাচনী মনোভাব ও আক্রমণাত্মক কৌশলের প্রতীক৷ অনুব্রত মণ্ডলের বক্তব্যে এই স্লোগান নতুন করে প্রাণ পাচ্ছে, যা কর্মীদের উজ্জীবিত করছে এবং ভোটারদের মধ্যেও উত্তেজনা তৈরি করছে৷

পঞ্চমত, তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষের বিবেচনাবোধ নিয়ে-‘মানুষ কি এতই বোকা, আবার অন্ধকার নামিয়ে আনবে?’-এই মন্তব্যে তিনি অতীতের ৩৪ বছরের বাম শাসনের প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের সঙ্গে তুলনা করছেন৷ এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চাইছেন, মানুষ একবার পরিবর্তনের স্বাদ পেয়েছে, তাই তারা আর পিছনে ফিরতে চাইবে না৷ এই ধরনের বক্তব্য ভোটারদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলতে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে৷

ষষ্ঠত, বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগও যথেষ্ট তীব্র৷ তিনি দাবি করেছেন, বীরভূম জুডে় বিজেপি ‘জাল বিস্তার’ করার চেষ্টা করেছিল-অর্থাৎ সংগঠন ভাঙা, নেতা-কর্মীদের টেনে নেওয়া, এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নানা কৌশল নিয়েছিল৷ কিন্ত্ত শেষ পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলেই তাঁর দাবি৷ এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বিজেপিকে বহিরাগত শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, যা স্থানীয় ভোটারদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে৷

সপ্তমত, দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কথাও তিনি অস্বীকার করেননি৷ বরং খোলাখুলি স্বীকার করেছেন যে কিছু ভুল ছিল, যার ফলে একটি আসন হাতছাড়া হয়েছে৷ এই স্বীকারোক্তি তাঁর বক্তব্যকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে, কারণ এতে আত্মসমালোচনার ইঙ্গিত রয়েছে৷ একই সঙ্গে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আরও শক্তভাবে লড়বে দল৷

অষ্টমত, তাঁর প্রচারে ‘জনসংযোগ’ একটি বড় অস্ত্র৷ তিনি বারবার জোর দিচ্ছেন মানুষের পাশে থাকার উপর-গ্রামে গ্রামে গিয়ে কথা বলা, সমস্যার সমাধান করা, এবং সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক গডে় তোলা৷ এই কৌশল গ্রামীণ এলাকায় বিশেষভাবে কার্যকর, যেখানে ব্যক্তিগত যোগাযোগ এখনও বড় ভূমিকা রাখে৷

অনুব্রত মণ্ডলের পুরো প্রচার কৌশলকে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যায়-এটি আবেগ, আত্মবিশ্বাস, আক্রমণাত্মক ভাষা এবং সংগঠনের শক্তির এক মিশ্রণ৷ তিনি একদিকে নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প তুলে ধরছেন, অন্যদিকে বিরোধীদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালাচ্ছেন৷ একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন কর্মী ও সমর্থকদের৷

বীরভূমের ভোটপ্রচার এখন কার্যত ‘কেষ্ট ফ্যাক্টর’-এর উপরই ঘুরছে৷ তাঁর প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিটি প্রতিশ্রুতি রাজনীতির ময়দানে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে৷ এখন দেখার বিষয়, এই আত্মবিশ্বাসী সুর এবং আক্রমণাত্মক প্রচার কতটা প্রভাব ফেলতে পারে ভোটবাক্সে-আর সত্যিই কি তিনি তাঁর দাবি মতো ১১-তে ১১ আসন জিতে দলকে উপহার দিতে পারবেন, নাকি বিরোধীরা পাল্টা লড়াইয়ে চমক দেখাবে৷


Discover more from Sangbad Hate Bazare

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

By Sangbad Hate Bazare

“Sangbad Hate Bazare”—”News in the Marketplace”—is more than just a name. It is a commitment to bringing authentic, accessible, and people-centric journalism to the digital streets of Bengal and beyond. Inspired by the ethos of public discourse and open conversation, we present news that’s as diverse and dynamic as the society we serve. Operating under the digital identity “ehatebazare”, our platform is built for the Bengali-speaking global audience. Whether you are in Kolkata, Siliguri, Dhaka, London, or New York, if you speak Bengali, we are your home for news and insights.

Related Post

Leave a Reply

Discover more from Sangbad Hate Bazare

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading