Site icon Sangbad Hate Bazare

‘সিপিএম-কংগ্রেসকে মুছে দিয়েছি, এবার বিজেপির পালা!’—বীরভূমে কেষ্টর হুঙ্কারে তুঙ্গে ভোটের উত্তাপ

বীরভূমের রাজনৈতিক ময়দান আবারও তপ্ত, আর সেই উত্তাপের কেন্দ্রে তৃণমূলের দাপুটে নেতা অনুব্রত মন্ডল-যিনি ‘কেষ্ট’ নামেই বেশি পরিচিত৷ ভোট যত এগোচ্ছে, ততই তাঁর আগ্রাসী সুর, আত্মবিশ্বাসী বার্তা এবং চ্যালেঞ্জে সরগরম হয়ে উঠছে জেলা রাজনীতি৷ স্পষ্ট ভাষায় তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, একসময় যেমন কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (Marxist) (সিপিএম) এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস-কে বীরভূমের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে প্রায় মুছে ফেলা হয়েছে, ঠিক একই পরিণতি অপেক্ষা করছে ভারতীয় জনতা পার্টি-র জন্যও৷ এই বক্তব্য ঘিরেই তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তরজা, যা এখন ভোটের প্রচারে অন্যতম বড় ইসু্য৷

প্রথমত, অনুব্রত মণ্ডলের বক্তব্যে উঠে এসেছে তাঁর ব্যক্তিগত লড়াই এবং দলের প্রতি অটুট আনুগত্যের গল্প৷ তাঁর দাবি, বিজেপির তরফে একাধিকবার তাঁকে দলে টানার চেষ্টা হয়েছে, কিন্ত্ত তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন৷ শুধু তাই নয়, এই সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি৷ তাঁর মেয়ে সুকন্যা মণ্ডলের জেলযাত্রার প্রসঙ্গ তুলে তিনি আবেগঘন বার্তা দেন-যা ভোটারদের মধ্যে সহানুভূতির সুর তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে৷ এই আবেগ, রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে মিশে তৈরি করছে এক শক্তিশালী প্রচার-ন্যারেটিভ৷

দ্বিতীয়ত, সংগঠনের শক্তি নিয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস নজরকাড়া৷ প্রায় আড়াই বছর জেলবন্দি থাকার পরেও বীরভূমে তৃণমূলের সংগঠনে কোনও ভাঙন ধরেনি-এই দাবিই তিনি বারবার তুলে ধরছেন৷ তাঁর কথায়, ‘আমাকে বন্দি রেখেও সংগঠন ভাঙতে পারেনি কেউ’-এই বার্তা সরাসরি বিরোধীদের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুঁডে় দেয়৷ গত লোকসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের উদাহরণ টেনে তিনি বোঝাতে চাইছেন, দলের ভিত্তি এখনও অটুট এবং জনসমর্থন দৃঢ়৷

তৃতীয়ত, আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে তাঁর লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট-বীরভূমের ১১টি বিধানসভা আসনেই জয়৷ ২০২১ সালের নির্বাচনে দুবরাজপুর আসন হারানোর কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, সেটা ছিল দলের নিজেদের ভুলের ফল৷ তবে এবার সেই ভুল আর হবে না বলেই আত্মবিশ্বাসী তিনি৷ প্রতিটি কেন্দ্রে নিজে গিয়ে প্রচার করবেন, জনসংযোগ বাড়াবেন, এমনকি দলীয় প্রার্থীদের পাশে দাঁডি়য়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করবেন-এই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন৷

চতুর্থত, তাঁর বিখ্যাত ‘খেলা হবে’ স্লোগান আবারও রাজনৈতিক ময়দানে গর্জে উঠেছে৷ এই স্লোগান শুধু একটি বাক্য নয়, বরং তৃণমূলের নির্বাচনী মনোভাব ও আক্রমণাত্মক কৌশলের প্রতীক৷ অনুব্রত মণ্ডলের বক্তব্যে এই স্লোগান নতুন করে প্রাণ পাচ্ছে, যা কর্মীদের উজ্জীবিত করছে এবং ভোটারদের মধ্যেও উত্তেজনা তৈরি করছে৷

পঞ্চমত, তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষের বিবেচনাবোধ নিয়ে-‘মানুষ কি এতই বোকা, আবার অন্ধকার নামিয়ে আনবে?’-এই মন্তব্যে তিনি অতীতের ৩৪ বছরের বাম শাসনের প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের সঙ্গে তুলনা করছেন৷ এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চাইছেন, মানুষ একবার পরিবর্তনের স্বাদ পেয়েছে, তাই তারা আর পিছনে ফিরতে চাইবে না৷ এই ধরনের বক্তব্য ভোটারদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলতে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে৷

ষষ্ঠত, বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগও যথেষ্ট তীব্র৷ তিনি দাবি করেছেন, বীরভূম জুডে় বিজেপি ‘জাল বিস্তার’ করার চেষ্টা করেছিল-অর্থাৎ সংগঠন ভাঙা, নেতা-কর্মীদের টেনে নেওয়া, এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নানা কৌশল নিয়েছিল৷ কিন্ত্ত শেষ পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলেই তাঁর দাবি৷ এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বিজেপিকে বহিরাগত শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, যা স্থানীয় ভোটারদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে৷

সপ্তমত, দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কথাও তিনি অস্বীকার করেননি৷ বরং খোলাখুলি স্বীকার করেছেন যে কিছু ভুল ছিল, যার ফলে একটি আসন হাতছাড়া হয়েছে৷ এই স্বীকারোক্তি তাঁর বক্তব্যকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে, কারণ এতে আত্মসমালোচনার ইঙ্গিত রয়েছে৷ একই সঙ্গে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আরও শক্তভাবে লড়বে দল৷

অষ্টমত, তাঁর প্রচারে ‘জনসংযোগ’ একটি বড় অস্ত্র৷ তিনি বারবার জোর দিচ্ছেন মানুষের পাশে থাকার উপর-গ্রামে গ্রামে গিয়ে কথা বলা, সমস্যার সমাধান করা, এবং সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক গডে় তোলা৷ এই কৌশল গ্রামীণ এলাকায় বিশেষভাবে কার্যকর, যেখানে ব্যক্তিগত যোগাযোগ এখনও বড় ভূমিকা রাখে৷

অনুব্রত মণ্ডলের পুরো প্রচার কৌশলকে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যায়-এটি আবেগ, আত্মবিশ্বাস, আক্রমণাত্মক ভাষা এবং সংগঠনের শক্তির এক মিশ্রণ৷ তিনি একদিকে নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প তুলে ধরছেন, অন্যদিকে বিরোধীদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালাচ্ছেন৷ একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন কর্মী ও সমর্থকদের৷

বীরভূমের ভোটপ্রচার এখন কার্যত ‘কেষ্ট ফ্যাক্টর’-এর উপরই ঘুরছে৷ তাঁর প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিটি প্রতিশ্রুতি রাজনীতির ময়দানে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে৷ এখন দেখার বিষয়, এই আত্মবিশ্বাসী সুর এবং আক্রমণাত্মক প্রচার কতটা প্রভাব ফেলতে পারে ভোটবাক্সে-আর সত্যিই কি তিনি তাঁর দাবি মতো ১১-তে ১১ আসন জিতে দলকে উপহার দিতে পারবেন, নাকি বিরোধীরা পাল্টা লড়াইয়ে চমক দেখাবে৷

Exit mobile version