Site icon Sangbad Hate Bazare

বাবা সাংসদ, ছেলে প্রার্থী—উত্তরপাড়ায় তৃণমূলের নতুন বাজি শীর্ষণ্য

হুগলির রাজনৈতিক মানচিত্রে বারবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা উত্তরপাড়া বিধানসভা আসন ফের একবার শিরোনামে, আর তার নেপথ্যে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন বাজি শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রার্থী বদল, ভোটের ওঠানামা কিংবা রাজনৈতিক সমীকরণের নাটকীয় পরিবর্তন—সব মিলিয়ে উত্তরপাড়া বরাবরই হাই-প্রোফাইল আসন হিসেবে পরিচিত। এবারের নির্বাচনে সেই উত্তেজনা আরও বেড়েছে, কারণ এই আসনে প্রার্থী হয়েছেন অভিজ্ঞ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে শীর্ষণ্য। রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে এলেও শীর্ষণ্য নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন সম্পূর্ণ আলাদা পথে—ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী মহলে প্রতিষ্ঠিত মুখ হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে। তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সক্রিয় কর্মী হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু, যা ধীরে ধীরে তাঁকে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ আইনগত লড়াইয়ের মুখ করে তুলেছে। আর জি কর হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রাথমিক ও এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতি, ঝাড়গ্রাম মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকের রহস্যমৃত্যু, সন্দেশখালির গণধর্ষণ মামলা কিংবা বেআইনি হোর্ডিং ইস্যু—একাধিক চর্চিত মামলায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে রাজনৈতিক ও সামাজিক দুই ক্ষেত্রেই পরিচিতি দিয়েছে। ফলে শুধুমাত্র ‘তারকা প্রার্থী’ নয়, বরং একজন লড়াকু আইনজীবী হিসেবে তাঁর ভাবমূর্তি তৃণমূলের জন্য বড় সম্পদ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এই আসনকে ঘিরে জল্পনা কম ছিল না। বিশেষ করে জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ইমন চক্রবর্তীর নাম ঘুরে বেড়াচ্ছিল সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে, যা রাজনৈতিক মহলে চর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষমেশ সেই জল্পনায় জল ঢেলে দল আস্থা রাখে শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরই। এর ফলে স্পষ্ট যে তৃণমূল এবার উত্তরপাড়ায় ‘গ্ল্যামার’ নয়, বরং সংগঠন, আইনি লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা এবং তরুণ নেতৃত্বকে সামনে রাখতে চাইছে। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন শীর্ষণ্যের বাবা তথা শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ছেলের প্রার্থী হওয়ায় তিনি আবেগাপ্লুত প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, শীর্ষণ্য ছাত্র রাজনীতি থেকেই দলের সঙ্গে যুক্ত এবং নিজের যোগ্যতায় একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী হিসেবে উঠে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ওপর ভরসা রেখেছেন, এর জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। একইসঙ্গে তিনি বিশ্বাস প্রকাশ করেছেন যে তাঁর ছেলে রাজনৈতিক জীবনে তাঁর থেকেও ভালো কাজ করবে—যা এই প্রজন্মের নেতৃত্বের প্রতি তৃণমূলের আস্থার প্রতিফলন।

উত্তরপাড়ার ভোটের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এই আসনে জয়লাভ কখনোই সহজ ছিল না। ২০১১ সালে পরিবর্তনের জোয়ারে তৃণমূলের অনুপ ঘোষাল প্রায় ৬০ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যেখানে সিপিএমের শ্রুতিনাথ প্রহরাজ উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু ২০১৬ সালে সেই ভোটের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যখন প্রবীর ঘোষাল প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন এবং সিপিএমের সঙ্গে ব্যবধান অনেকটাই কমে আসে। ২০২১ সালে কাঞ্চন মল্লিক কিছুটা ভোট বাড়াতে পারলেও স্থানীয় অসন্তোষের অভিযোগ ক্রমশ সামনে আসে। এলাকার মানুষদের একাংশের দাবি, বিধায়ককে এলাকায় খুব একটা দেখা যায় না, উন্নয়নমূলক কাজের গতিও প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়। এই অসন্তোষই এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থী হওয়া নিঃসন্দেহে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। তরুণ, শিক্ষিত, আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসা—এই চারটি বৈশিষ্ট্য তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। তৃণমূলের কাছে এটি একপ্রকার ‘রিসেট’ বোতাম চাপার মতো, যেখানে নতুন মুখের মাধ্যমে পুরনো ক্ষত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বামেদের প্রার্থী মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়ও লড়াইয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ বাম শিবির এই আসনে ঐতিহাসিকভাবে শক্ত ভিত তৈরি করে রেখেছে। ফলে উত্তরপাড়া এবার শুধু একটি আসন নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠতে চলেছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, উত্তরপাড়ার এই নির্বাচন শুধুমাত্র প্রার্থী বনাম প্রার্থীর লড়াই নয়, বরং অভিজ্ঞতা বনাম তরুণ নেতৃত্ব, অতীতের কাজ বনাম ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি—এই দুইয়ের সংঘর্ষ। শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় কি তাঁর আইনজীবীসুলভ লড়াকু মানসিকতা এবং রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ভোটারদের মন জয় করতে পারবেন? কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশাবাদ কি বাস্তবে রূপ নেবে? নাকি বিরোধীরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সমীকরণ বদলে দেবে? সেই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ভোটের ফলেই, তবে এতটুকু নিশ্চিত—উত্তরপাড়া আবারও বাংলার রাজনীতির অন্যতম ‘হটসিট’ হয়ে উঠেছে, যেখানে প্রতিটি ভোটই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক দিকনির্দেশ।

Exit mobile version