আইপিএলের মঞ্চে আবারও নতুন বিতর্ক—বোর্ডের বহুল আলোচিত ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ নিয়ম নিয়ে ক্রমশ বাড়ছে অসন্তোষের সুর। রোহিত শর্মা ও হার্দিক পাণ্ডিয়ার পর এবার সরব হলেন দিল্লি ক্যাপিটালসের অধিনায়ক অক্ষর প্যাটেল। দেশের টি-টোয়েন্টি দলের সহ অধিনায়ক হিসেবে তাঁর বক্তব্য এখন স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। অক্ষরের সরাসরি মন্তব্য, একজন অলরাউন্ডার হিসেবে এই নিয়ম তাঁর মোটেই পছন্দ নয়। কারণ, এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর থেকে দলের ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এসেছে, আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে অলরাউন্ডারদের ওপরেই। ২০২৩ আইপিএলে প্রথম চালু হওয়া এই ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ নিয়মে দলগুলি ম্যাচ চলাকালীন নির্দিষ্ট সময়ে বেঞ্চে থাকা পাঁচজনের তালিকা থেকে একজনকে পরিবর্ত হিসেবে নামাতে পারে। বোর্ড ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, ২০২৭ সাল পর্যন্ত এই নিয়ম বহাল থাকবে। ফলে এই নিয়মকে কেন্দ্র করে বিতর্ক আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অক্ষর প্যাটেলের বক্তব্যে স্পষ্ট, এই নিয়মের ফলে ক্রিকেটের প্রথাগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। আগে যেখানে একজন অলরাউন্ডারকে দলে নেওয়া হত ব্যাটিং ও বোলিং—দুই ক্ষেত্রেই অবদান রাখার জন্য, এখন সেই প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে যাচ্ছে। কারণ, দল চাইলে অতিরিক্ত ব্যাটার বা বোলার নামাতে পারছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—তাহলে অলরাউন্ডারের গুরুত্ব কোথায়? অক্ষরের কথায়, “দলগুলো এখন ভাবছে, আলাদা করে অলরাউন্ডার রাখার প্রয়োজন কী?”—এই প্রশ্নটাই বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। শুধু অক্ষর নন, এর আগে রোহিত শর্মা সরাসরি বলেছিলেন, এই নিয়ম ভারতীয় ক্রিকেটে ভবিষ্যতের অলরাউন্ডার তৈরি হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। হার্দিক পাণ্ডিয়াও একই সুরে মন্তব্য করেছিলেন, অলরাউন্ডারদের সুযোগ কমে গেলে দলের সামগ্রিক ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পরিসংখ্যানও যেন সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করছে। গত আইপিএলে অক্ষর প্যাটেল মোটে ২০৪ বল করেছিলেন, যা আগের মরসুমের তুলনায় প্রায় দশ ওভার কম। যদিও তিনি নিজে জানিয়েছেন, আঙুলের চোটের কারণেই তাঁকে কিছুটা সংযত থাকতে হয়েছিল, তবুও ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ নিয়মের কারণে অধিনায়করা অনেক সময় বিকল্প বোলার ব্যবহার করতে পারছেন, ফলে অলরাউন্ডারদের ওপর চাপ কমে যাচ্ছে—কিন্তু সেই সঙ্গে কমছে তাঁদের অংশগ্রহণও। এতে খেলোয়াড়দের দক্ষতার পূর্ণ বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে বলেই আশঙ্কা।
তবে বিতর্কের মাঝেও অক্ষরের আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি স্বীকার করেছেন, নিয়ম যখন রয়েছে, তখন তা মেনে চলতেই হবে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তাঁর এই নিয়ম অপছন্দ। এই দ্বৈত অবস্থানই বর্তমান ক্রিকেট বাস্তবতার প্রতিফলন—যেখানে খেলোয়াড়রা বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিতে না পারলেও, নিজেদের মতামত স্পষ্টভাবে জানাতে পিছপা হচ্ছেন না। এর ফলে একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের জায়গা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বোর্ডের ওপরও চাপ বাড়ছে নিয়ম পুনর্বিবেচনার।
অক্ষর প্যাটেলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স ও অভিজ্ঞতা তাঁর বক্তব্যকে আরও ওজনদার করে তুলেছে। গত দেড় বছরে তিনি দু’বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছেন, দ্বিতীয়বার দেশের মাটিতে সহ অধিনায়ক হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই সাফল্যের ভিত্তিতে অনেকেই বর্তমান ভারতীয় টি-টোয়েন্টি দলকে সর্বকালের সেরা বলে আখ্যা দিচ্ছেন। এমনকি তুলনা টানা হচ্ছে ২০০০ দশকের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার অপরাজেয় ওয়ানডে দলের সঙ্গেও। কিন্তু অক্ষর এই তুলনায় বিশ্বাসী নন। তাঁর মতে, একটি দলের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে সঠিক কম্বিনেশন ও নির্ভীক ক্রিকেট খেলার মানসিকতার ওপর। তিনি বলেন, “২০২২ সাল থেকে আমরা কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এবং সেই অনুযায়ী খেলছি। ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলতে পারলেই দাপট দেখানো সম্ভব।”
এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, অক্ষর শুধুমাত্র একজন ক্রিকেটার নন, তিনি একজন চিন্তাশীল নেতা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন। তাঁর মতে, ‘সর্বকালের সেরা’ তকমা আসলে সময়ের ওপর নির্ভর করে, এবং প্রতিটি প্রজন্মের দলই তাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে সেরা হয়ে উঠতে পারে। এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ নিয়মকে কেন্দ্র করে আইপিএল আবারও এক নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। একদিকে বোর্ডের আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টা, অন্যদিকে ক্রিকেটের প্রথাগত কাঠামো রক্ষার দাবি—এই দ্বন্দ্বই এখন আলোচনার মূল বিষয়। রোহিত, হার্দিক, অক্ষরের মতো তারকারা যখন একই সুরে কথা বলছেন, তখন বোর্ডের পক্ষে এই বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে এই নিয়মে পরিবর্তন আসবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—ক্রিকেট শুধু খেলার মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়, এর বাইরেও কৌশল, নীতি ও সিদ্ধান্তের লড়াই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই লড়াইয়ের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে আগামী দিনের ক্রিকেটের নতুন দিশা।

