ভোটের ঠিক পাঁচ দিন আগে থেকেই বাংলায় ‘অঘোষিত রাষ্ট্রপতি শাসন’-এর মতো কঠোর প্রশাসনিক কাঠামো চালু করার ইঙ্গিত ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে৷ আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-কে কেন্দ্র করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও কড়াকড়ি ও নিয়ন্ত্রিত করতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের একাধিক পরিকল্পনা সামনে এসেছে, যা একদিকে যেমন নিরাপত্তা জোরদারের দাবি তুলছে, অন্যদিকে বিরোধীরা এটিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি বলেও আখ্যা দিচ্ছে৷ সূত্রের খবর, ভোটের পাঁচ দিন আগে থেকেই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব কার্যত কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার রূপরেখা তৈরি হচ্ছে, যেখানে রাজ্য পুলিশের ভূমিকা অনেকটাই সীমিত করে দেওয়া হতে পারে৷
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, থানাগুলিকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে শুধুমাত্র আইনি প্রক্রিয়া ও কেস ডায়েরি লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হতে পারে৷ অর্থাৎ, মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেবে আধা-সামরিক বাহিনী৷ এমনকি ভোটের দিনও বুথ পরিচালনা, লাইনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ভোটারদের সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুলিশের বদলে বিএলও ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপর ন্যস্ত করার ভাবনা রয়েছে৷ এই পরিবর্তন যে শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-তা স্পষ্ট৷ কারণ, এতদিন ধরে রাজ্য পুলিশই বুথ ব্যবস্থাপনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করত৷
এই প্রেক্ষাপটে বিরোধীরা সরব হয়ে উঠেছে৷ তাদের দাবি, নরেন্দ্র মোদীর আমলেই দেশজুড়ে একধরনের ‘অঘোষিত রাষ্ট্রপতি শাসন’ চালু হয়েছে, যেখানে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে৷ বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী আগেও একাধিকবার এই অভিযোগ তুলেছেন এবং এবার ভোটের আগে সেই আশঙ্কাই যেন বাস্তব রূপ নিতে চলেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা৷ তাদের মতে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রাজ্যের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন তুলতে পারে৷
এদিকে, নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন জেলার জেলাশাসক, পুলিশ সুপার, পর্যবেক্ষক এবং মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকরা৷ সেখানে জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভোটের আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হবে৷ ইতিমধ্যেই জানা গিয়েছে, এই মাসের মধ্যেই আরও প্রায় দুই হাজার কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে মোতায়েন করা হতে পারে৷ ফলে নিরাপত্তার দিক থেকে নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিতে চলেছে প্রশাসন৷
অন্যদিকে, শুধুমাত্র নিরাপত্তা নয়-প্রচারের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি বাড়িয়েছে কমিশন৷ বিশেষ করে সমাজমাধ্যমে ভুয়ো প্রচার রুখতে নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে৷ এবার থেকে প্রত্যেক প্রার্থীকে মনোনয়নপত্রে নিজেদের সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হবে৷ কোন প্ল্যাটফর্মে কতগুলি অ্যাকাউন্ট রয়েছে, কোনগুলি অফিসিয়াল বা স্বীকৃত-সব কিছু হলফনামায় উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে৷ এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হল, গোপন বা ভুয়ো অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর প্রচার বন্ধ করা৷
শুধু তাই নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম জারি হয়েছে৷ কোনও প্রার্থী, দল বা সংগঠন যদি অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিতে চায়, তবে আগে মিডিয়া সার্টিফিকেশন অ্যান্ড মনিটরিং কমিটি (MCMC)-র অনুমোদন নিতে হবে৷ অনুমোদন ছাড়া কোনও বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হলে তা নির্বাচনী বিধিভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷ এই নিয়ম ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটারসহ সমস্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জন্য প্রযোজ্য৷
প্রার্থীরা জেলার এমসিএমসি-তে বিজ্ঞাপনের অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে পারবেন এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেই আবেদন করতে হবে৷ পাশাপাশি, কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি থাকলে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের নেতৃত্বে গঠিত আপিল কমিটির দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে৷ ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত করার চেষ্টা করছে কমিশন৷
এছাড়া, নির্বাচন চলাকালীন ‘পেইড নিউজ’ বা টাকা দিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতার উপরও কড়া নজর রাখা হবে৷ কমিশন ইতিমধ্যেই পুলিশ, নোডাল অফিসার এবং বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে৷ তাদের মতে, ভোটের আগে ভুয়ো খবর ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রবণতা বাড়ছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক৷
আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-কে কেন্দ্র করে যে ধরনের কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত মিলছে, তা একদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, অন্যদিকে তা রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে৷ ‘অঘোষিত রাষ্ট্রপতি শাসন’ বিতর্ক, কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েন, পুলিশের ভূমিকা সীমিত করা, এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় নজরদারি-সব কিছু মিলিয়ে এবারের নির্বাচন যে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নজিরবিহীন হতে চলেছে, তা বলাই যায়৷
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও কৌতূহল ও উদ্বেগ-দুই-ই বাড়ছে৷ একদিকে নিরাপত্তার আশ্বাস, অন্যদিকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মাত্রা-এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নির্বাচন কমিশনের সামনে৷
Discover more from Sangbad Hate Bazare
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

