রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন যত এগোচ্ছে, ততই রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে উঠছে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলিতে। সেই আবহেই বিজেপির চতুর্থ দফার প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিল হাওড়া দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র। ১৩টি কেন্দ্রের প্রার্থীর নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সামনে আসে শ্যামল হাতির নাম—যিনি প্রাক্তন জেলা সভাপতি, দীর্ঘদিনের দলীয় কর্মী এবং স্থানীয়ভাবে ‘ভূমিপুত্র’ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু এত পরিচিতি সত্ত্বেও তাঁর প্রার্থীপদ ঘোষণার পর থেকেই দলের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র অসন্তোষ, যা এখন কার্যত প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
🔴 প্রার্থী ঘোষণা ঘিরে ক্ষোভের বিস্ফোরণ
প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পরদিন সকালেই শ্যামল হাতি হাওড়া জেলা সভাপতি গৌরাঙ্গ ভট্টাচার্যকে সঙ্গে নিয়ে রামরাজাতলার রামমন্দিরে পুজো দিয়ে নির্বাচনী প্রচারের সূচনা করেন। কিন্তু এই সূচনাতেই স্পষ্ট হয়ে যায় দলের ভেতরের অস্বস্তির ছবি—দক্ষিণ হাওড়ার প্রথম সারির নেতৃত্বদের অনেককেই দেখা যায়নি প্রচারে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি নিছক অনুপস্থিতি নয়, বরং এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ। অন্যদিকে, দিনভর সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের ক্ষোভ উগরে পড়তে থাকে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
🟡 চার মন্ডল সভাপতির এক সুরে আপত্তি
দক্ষিণ হাওড়া কেন্দ্রের চারটি মন্ডলের সভাপতি—দেবিকা নায়েক, আদিত্য সামন্ত, রবীন পাল এবং অমর্ত্য ভৌমিক—প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে প্রায় একই সুরে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী রন্তিদেব সেনগুপ্ত প্রায় ৬০ হাজার ভোট পেলেও প্রায় ৫০ হাজার ভোটে পরাজিত হন। তবে সেই পরাজয়ের পর গত পাঁচ বছরে বুথস্তরের কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে সংগঠনকে শক্তিশালী করেছেন এবং জয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান প্রার্থী নির্বাচন সেই সমস্ত পরিশ্রমকে কার্যত ব্যর্থ করে দিয়েছে।
🟢 ‘ভুল প্রার্থী, নিশ্চিত পরাজয়’—দেবিকা নায়েকের মন্তব্য
১ নম্বর মন্ডলের সভাপতি দেবিকা নায়েক স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই প্রার্থী নির্বাচন বিজেপির পরাজয় নিশ্চিত করতে পারে। তাঁর কথায়, “আমরা বরিষ্ঠ নয়, বলিষ্ঠ প্রার্থী চেয়েছিলাম।” ৮০টি বুথ নিয়ে গঠিত এই মন্ডলে কর্মীদের মতে, বর্তমান প্রার্থী প্রচার ও জনসংযোগে শাসক দলের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়বেন। ফলে নির্বাচনী লড়াইয়ের শুরুতেই বিজেপি কার্যত দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।
🔵 অন্তর্দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত—আদিত্য সামন্তের বিস্ফোরক দাবি
২ নম্বর মন্ডল সভাপতি আদিত্য সামন্ত আরও এক ধাপ এগিয়ে সরাসরি দলের ভেতরের অন্তর্দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতৃত্ব বা বুথস্তরের কর্মীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ৯৩টি বুথের কর্মী-সমর্থকদের মতামত উপেক্ষা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তাঁর দাবি। নাম না করলেও তিনজন সাংগঠনিক নেতার ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “যদি বরুণ কুমার বারিকদারকে প্রার্থী করা হতো, তাহলে লড়াই আরও জোরদার হতো।” তাঁর মতে, এখনও যদি প্রার্থী পরিবর্তন করা হয়, তাহলে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হতে পারে।
🟣 কর্মীদের অনীহা ও হতাশা—রবীন পালের পর্যবেক্ষণ
৩ নম্বর মন্ডল সভাপতি রবীন পাল জানিয়েছেন, দেরিতে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ এবং সেই তালিকায় শ্যামল হাতির নাম দেখে কর্মীদের মধ্যে উৎসাহের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। তাঁর মতে, বরুণ কুমার বারিকদারের মতো জনপ্রিয় প্রার্থী হলে কর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াইয়ে নামতে পারতেন।
🟠 সংগঠনের চ্যালেঞ্জ—অমর্ত্য ভৌমিকের বিশ্লেষণ
৪ নম্বর মন্ডল সভাপতি অমর্ত্য ভৌমিক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জানিয়েছেন, এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থীকে হারাতে গেলে যে ধরনের সুসংগঠিত প্রচার প্রয়োজন, তার জন্য উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি ছিল। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে হতাশ কর্মীদের একত্রিত করে লড়াইয়ে নামানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
⚖️ রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মোড়
এই কেন্দ্রের পরিস্থিতি এখন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কাছেও চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে যেখানে বিজেপির অন্দরেই ক্ষোভ ও বিভাজন স্পষ্ট, অন্যদিকে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস এই সুযোগকে কাজে লাগাতে প্রস্তুত। কর্মীদের মনোবল ভেঙে গেলে নির্বাচনী লড়াইয়ে তার প্রভাব পড়া অবশ্যম্ভাবী—এমনটাই মত রাজনৈতিক মহলের।
📊 নির্বাচনের আগে বড় প্রশ্নচিহ্ন
আগামী ২৯শে এপ্রিল ভোটের আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিজেপি নেতৃত্ব কি এই অসন্তোষকে গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী পরিবর্তনের পথে হাঁটবে? নাকি বর্তমান প্রার্থী নিয়েই লড়াই চালাবে? যদি পরিবর্তন না হয়, তাহলে গতবারের পরাজয়ের ব্যবধান আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
🔥 লড়াইয়ের আগেই চাপে বিজেপি
দক্ষিণ হাওড়া বিধানসভা কেন্দ্র এখন বিজেপির কাছে এক কঠিন পরীক্ষার ক্ষেত্র। সংগঠনের ভিত মজবুত হলেও প্রার্থী নির্বাচন ঘিরে অসন্তোষ সেই ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এই পরিস্থিতিতে অনেকটাই আত্মবিশ্বাসী। এখন দেখার, বিজেপি নেতৃত্ব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্মীদের মনোবল ফেরাতে পারে কিনা—নাকি অভ্যন্তরীণ কোন্দলই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে দেয়।
এই কেন্দ্রের ফলাফল শুধু একটি আসনের জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে না, বরং রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

