Site icon Sangbad Hate Bazare

মমতা-অভিষেকের আস্থায় ফের মাঠে গুলশন মল্লিক, পাঁচলায় উন্নয়নই মূল অস্ত্র

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ এক কেন্দ্র পাঁচলা বিধানসভা কেন্দ্র—যেখানে টানা তিন দফা নির্বাচন, অর্থাৎ ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস-এর প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে নিজের জনপ্রিয়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়েছেন গুলশন মল্লিক। এবারও আসন্ন নির্বাচনে তিনি একই কেন্দ্রে দলের প্রার্থী হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন করে আগ্রহ। তাঁর দীর্ঘদিনের কাজ, জনসংযোগ এবং উন্নয়নমূলক উদ্যোগের ভিত্তিতেই দল আবার তাঁর উপর আস্থা রেখেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি রবিবার সকালে এক নজিরবিহীন বাইক র‍্যালির মাধ্যমে সেই জনপ্রিয়তার বিস্ফোরণ যেন চোখে পড়ল। পুলিশের অনুমতি নিয়ে শুরু হওয়া প্রায় ১,৫০০টি বাইকের মিছিল মুহূর্তের মধ্যেই ফুলে-ফেঁপে প্রায় ১৪,০০০-এ পৌঁছে যায়। আমতা রোড কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়ে মানুষের ঢলে। বিকিহাকোলার রানীহাটি থেকে শুরু হওয়া এই বিশাল র‍্যালি বিধানসভা এলাকার ১৫টি পঞ্চায়েত ঘুরে দেখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শুভরআড়া ও জলা বিশ্বনাথপুরের হাউলিবাগানে পৌঁছতেই জনসমাগম এতটাই বেড়ে যায় যে সাধারণ মানুষের অসুবিধা এবং নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধ মাথায় রেখে নিজেই র‍্যালি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন গুলশন মল্লিক। ফলে হঠাৎ করেই র‍্যালি শেষ হয়ে যাওয়ায় কিছুটা হতাশ হন কর্মী-সমর্থকেরা, তবে সেই উচ্ছ্বাসই প্রমাণ করে তাঁর প্রতি মানুষের আবেগ কতটা প্রবল।

সন্ধ্যায় দলীয় কার্যালয়ে তিনি জানান, দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জীর নির্দেশেই তিনি আবারও পাঁচলাবাসীর সেবা করার সুযোগ পেয়েছেন। পাঁচবার তাঁর প্রতি দলের এই আস্থা রাখার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের উৎসাহও ছিল চোখে পড়ার মতো, যা আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূলের পক্ষে ইতিবাচক ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন অনেকেই।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধী শিবির এখনো পর্যন্ত পাঁচলায় শক্তিশালী প্রার্থী ঘোষণা করতে পারেনি, শুধুমাত্র ফরওয়ার্ড ব্লক ব্যতিক্রম। তবে এই বিষয়ে গুলশন মল্লিকের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট—কে প্রার্থী হবে, তা সংশ্লিষ্ট দলের বিষয়। তিনি নিজের লক্ষ্য স্থির রেখেছেন শুধুমাত্র মানুষের সেবা করা। তাঁর কথায়, “আমি অবিচল পাঁচলাবাসীর সেবায় নিবেদিত।”

উন্নয়নের প্রসঙ্গে তিনি তুলে ধরেন রাজ্য সরকারের একাধিক জনমুখী প্রকল্পের সাফল্যের কথা। লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, যুবসাথী—এই সব প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে। বিশেষ করে ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে পাঁচলা ব্লকে প্রায় ৯,০০০ এবং সমগ্র বিধানসভা কেন্দ্রে প্রায় ১৫,০০০ মানুষ সরাসরি সুবিধা পেয়েছেন। তাঁর দাবি, এই উন্নয়নের সুফলই ভোটে প্রতিফলিত হবে এবং মানুষ আবারও দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।

বিজেপিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক নীতির ফলে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। নোটবন্দী থেকে শুরু করে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা ছাড়া আর কিছুই করা হয়নি। তাঁর কথায়, “জুমলাবাজ, ধাপ্পাবাজ রাজনীতির দিন শেষ। মানুষ এখন সব বুঝে গিয়েছে।” তাই এবারের নির্বাচনে পাঁচলাবাসীসহ সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করবে বলেই তিনি আশাবাদী।

এসআইআর ইস্যুতে তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে লড়াই করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—যা দেশের অন্য কোনো মুখ্যমন্ত্রী করেননি। তাঁর মতে, এই পদক্ষেপ শুধু রাজ্যের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করেনি, বরং জাতীয় রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এক শক্তিশালী বিরোধী মুখ হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছে।

এছাড়াও তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্র সরকার রাজনৈতিক কারণে রাজ্যের প্রাপ্য প্রায় দুই লক্ষ কোটি টাকা আটকে রেখেছে, যার ফলে বহু উন্নয়ন প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবুও রাজ্য সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করে প্রকল্পগুলি চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই তৃণমূলকে মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে বলে দাবি তাঁর।

নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন প্রসঙ্গে তিনি স্বাগত জানিয়ে বলেন, “ভোট দেবে মানুষ, বাহিনী নয়।” তাঁর দাবি, তৃণমূল আমলে পশ্চিমবঙ্গে ভোট উৎসবের মতো হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং বিরোধী কর্মীরাও নিরাপদে ভোট দিতে পারেন।গত লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী প্রায় ৫৭,০০০ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। এবারের নির্বাচনে সেই ব্যবধান আরও বাড়বে বলেই তাঁর বিশ্বাস। কারণ হিসেবে তিনি তুলে ধরেন সাধারণ মানুষের উৎসাহ, দলীয় কর্মীদের উদ্দীপনা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা।

পাঁচলা বিধানসভা কেন্দ্রে গুলশন মল্লিকের প্রার্থীপদ ঘিরে যে আবেগ, সমর্থন এবং রাজনৈতিক গতি তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে—এই লড়াই শুধু একটি আসনের নয়, বরং উন্নয়ন বনাম প্রতিশ্রুতির এক বড় রাজনৈতিক সমীকরণ। আসন্ন নির্বাচনে সেই সমীকরণের ফলাফলই নির্ধারণ করবে পাঁচলার ভবিষ্যৎ পথচলা।

Exit mobile version