Thu. Mar 19th, 2026

দেশের কর্মসংস্থানের চিত্র নিয়ে ফের একবার বড়সড় বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে কেন্দ্রের সাম্প্রতিক রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই। বহু প্রতিশ্রুতি, বিশেষ করে বছরে ২ কোটি চাকরি সৃষ্টির আশ্বাসকে সামনে রেখে ক্ষমতায় আসা নরেন্দ্র মোদি-র সরকারের দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও চাকরির বাজারে প্রত্যাশিত উন্নতি যে হয়নি, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে পরিসংখ্যানেই। খোদ সংসদে উত্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট তরুণ-তরুণী এখনও বেকার—অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মিলছে না। এই তথ্য সামনে আসতেই তীব্র রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে, পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

লোকসভায় এক লিখিত প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রের তরফে যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কে বিষ্ণু প্রসাদ-এর প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় শ্রম প্রতিমন্ত্রী শোভা করন্দলাজে জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে স্নাতক স্তরে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ২৫.৯ শতাংশে। তবে বিভিন্ন সমীক্ষা এবং সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে এই হার ৩০ শতাংশ ছুঁয়েছে বা কিছু ক্ষেত্রে তারও বেশি। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত যুবকের মধ্যে অন্তত ৩০ জন কোনও কাজ পাচ্ছেন না—যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক সংকেত।

আরও চিন্তার বিষয় হল, শিক্ষার স্তর যত বাড়ছে, বেকারত্বের হারও তত বাড়ছে। কেন্দ্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, স্নাতকোত্তর স্তরে বেকারত্বের হার ৩২.২ শতাংশ—যা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেই চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। বরং দক্ষতা, বাজারের চাহিদা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব অনেক ক্ষেত্রেই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থান নীতির মধ্যে অসামঞ্জস্যকেই সামনে আনছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ডিগ্রি’ নয়, এখন প্রয়োজন ‘স্কিল’-এর উপর জোর দেওয়া—না হলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

শহর ও গ্রামের মধ্যে বেকারত্বের চিত্রেও দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট পার্থক্য। রিপোর্ট বলছে, শহরাঞ্চলে শিক্ষিত বেকারের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর শহরে প্রায় ১১.৬ শতাংশ যুবক-যুবতী কাজ পাচ্ছেন না, আর মাধ্যমিক স্তরে এই হার ৭.২ শতাংশ। অর্থাৎ শুধুমাত্র এই দুই স্তর মিলিয়ে শহরে প্রায় ১৯.২ শতাংশ তরুণ বেকার অবস্থায় রয়েছেন। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে শহরে চাকরির প্রতিযোগিতা অনেক বেশি হওয়া এবং প্রত্যাশার মাত্রাও তুলনামূলকভাবে উচ্চ হওয়া। অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলে অনেকেই স্বনির্ভর কাজ বা কৃষির সঙ্গে যুক্ত থাকায় বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে কম বলে দেখা যাচ্ছে।

এদিকে জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, সামগ্রিক বেকারত্বের হার ফেব্রুয়ারি মাসে সামান্য কমে ৪.৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের মাসে ছিল ৫ শতাংশ। তবে এই সামান্য হ্রাস বাস্তব সমস্যাকে ঢেকে রাখতে পারছে না বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। কারণ সামগ্রিক হার কমলেও শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড়সড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

অন্যদিকে, আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়-এর ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া’ রিপোর্টে আরও উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সি স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ—অর্থাৎ দেশের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দিক থেকেও প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন বেকার থাকা যুবকদের মধ্যে হতাশা, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপ বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

এই পুরো প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে চাপানউতোর। বিরোধীরা দাবি করছে, সরকারের কর্মসংস্থান নীতি ব্যর্থ, আর সরকার পাল্টা বলছে, নতুন নতুন উদ্যোগ যেমন স্টার্টআপ, স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই—এই উদ্যোগগুলির বাস্তব প্রভাব কতটা পড়ছে? কারণ মাঠে নেমে চাকরি খুঁজতে গিয়ে বহু তরুণ-তরুণী এখনও হতাশ হয়ে ফিরছেন।

সব মিলিয়ে, দেশের চাকরির বাজার যে এখনও বড়সড় সংকটের মধ্যে রয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শিক্ষিত বেকারত্বের এই ক্রমবর্ধমান হার শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, দেশের ভবিষ্যতের জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই সমস্যার সমাধানে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং কত দ্রুত বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়। কারণ প্রতিটি ডিগ্রিধারী যুবকের পিছনে রয়েছে একটি স্বপ্ন—নিজের পায়ে দাঁড়ানোর, পরিবারকে সহায়তা করার এবং দেশের উন্নয়নে অংশ নেওয়ার। সেই স্বপ্ন যদি বারবার ভেঙে যায়, তাহলে তার প্রভাব পড়বে গোটা সমাজব্যবস্থার উপরই।

By Sangbad Hate Bazare

“Sangbad Hate Bazare”—”News in the Marketplace”—is more than just a name. It is a commitment to bringing authentic, accessible, and people-centric journalism to the digital streets of Bengal and beyond. Inspired by the ethos of public discourse and open conversation, we present news that’s as diverse and dynamic as the society we serve. Operating under the digital identity “ehatebazare”, our platform is built for the Bengali-speaking global audience. Whether you are in Kolkata, Siliguri, Dhaka, London, or New York, if you speak Bengali, we are your home for news and insights.

Related Post

Leave a Reply