বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের উত্তপ্ত আবহে বড় ধাক্কা খেল ভারতীয় অর্থনীতি—মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার দামে নজিরবিহীন পতন রেকর্ড হল। শুক্রবার আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে ভারতীয় রুপি প্রথমবার ৯৩-এর গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেল প্রায় ৯৩.২৪-এ, যা এক কথায় ঐতিহাসিক নিম্নস্তর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, ক্রমবর্ধমান জ্বালানির দাম এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ডলারের দিকে ঝোঁক—এই তিনটি বড় কারণ মিলেই টাকার এই রেকর্ড পতনের পেছনে কাজ করছে। বর্তমান পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে খুব শীঘ্রই ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য ৯৪ ছুঁতে পারে, এমনকি ‘সেঞ্চুরি’ বা ১০০ টাকার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অর্থনীতিবিদরা।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল আকার নিচ্ছে। ইরান এবং ইজরায়েল-এর মধ্যে সংঘর্ষ, তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-এর প্রত্যক্ষ জড়িত থাকা গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব পড়েছে মারাত্মকভাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে, যা আমদানিনির্ভর দেশগুলির জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। ভারত যেহেতু তার প্রয়োজনীয় তেলের একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে, তাই এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি এবং মুদ্রার উপরে।
এই পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে ডলারের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে ডলারের চাহিদা বাড়ছে এবং তার তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়ছে ভারতীয় রুপি। গত ৪ মার্চ প্রথমবার টাকার মূল্য ৯২-এর গণ্ডি ছাড়ায়, তখন ডলার দাঁড়িয়েছিল ৯২.১৭ টাকায়। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই পতন আরও গভীর হয়েছে। ৯২.৩০ থেকে সরাসরি ৯৩.২৪—এই দ্রুত অবমূল্যায়ন অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র একদিনে প্রায় ০.৪ শতাংশ কমেছে টাকার মূল্য, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বড়সড় অস্থিরতার লক্ষণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও তীব্র হয় এবং তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছে যায়, তাহলে ভারতের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে। তেলের আমদানি বিল বেড়ে গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারের উপর চাপ বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে টাকার মূল্যে। সেই পরিস্থিতিতে ডলারপিছু টাকার দাম ৯৪ ছাড়িয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তবে এর মধ্যেও একটি আশার দিক দেখা গিয়েছে শেয়ার বাজারে। শুক্রবার BSE Sensex প্রায় ৮০০ পয়েন্টের কাছাকাছি বৃদ্ধি দেখিয়েছে, যা কিছুটা হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে। কিন্তু মুদ্রার এই লাগাতার পতন দীর্ঘমেয়াদে শেয়ার বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানির খরচ বাড়ে, যা কর্পোরেট লাভে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই পরিস্থিতির সূচনা ঘটে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে, যখন ইরান-এর মাটিতে যৌথ সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল। সেই হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং পরবর্তী সময়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে ইরান। তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর উপর একের পর এক হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। এর প্রভাব পড়ে সরাসরি ভারতীয় অর্থনীতির উপর।
ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। একদিকে বাড়ছে আমদানি ব্যয়, অন্যদিকে মুদ্রার অবমূল্যায়ন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহণ খরচ বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কিছুর উপর। ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে, যা সাধারণ মানুষের জন্য আরও উদ্বেগজনক।
বর্তমান পরিস্থিতি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। টাকার এই রেকর্ড পতন শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি বিশ্ব রাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের সম্মিলিত প্রভাবের ফল। এখন দেখার বিষয়, যুদ্ধ পরিস্থিতি কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ভারত সরকার ও রিজার্ভ ব্যাংক কী পদক্ষেপ নেয় এই সংকট মোকাবিলায়। তবে আপাতত যা পরিস্থিতি, তাতে টাকার উপর চাপ অব্যাহত থাকারই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

