পরপর তিন ম্যাচে সাত পয়েন্ট হাতছাড়া—এই পরিসংখ্যানটাই যেন এখন লাল-হলুদ শিবিরে অস্বস্তি, ক্ষোভ আর অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ঐতিহ্যবাহী ক্লাব East Bengal FC-এর সমর্থকদের মধ্যে জমতে থাকা হতাশা এখন আর গোপন নেই; মাঠে যেমন ফল আসছে না, তেমনই গ্যালারিতেও ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। “গো ব্যাক কোচ” ধ্বনি শোনা গিয়েছে বারবার, আর তার কেন্দ্রবিন্দুতে স্প্যানিশ কোচ Oscar Bruzon। তবে প্রশ্ন উঠছে—এই কি তাঁর বিদায়ের ইঙ্গিত, নাকি সাময়িক খারাপ সময়ের মধ্যেই তিনি আবার দলকে ঘুরে দাঁড় করাবেন? আপাতত সেই উত্তর অনিশ্চিতই রয়ে গেছে, কারণ মঙ্গলবারও তাঁর নেতৃত্বেই অনুশীলনে নামছেন লাল-হলুদ ফুটবলাররা, যা স্পষ্ট করে দেয় যে ক্লাব এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি।
ক্লাবের ভেতরে-বাইরে নানা গুঞ্জন শোনা গেলেও, বাস্তবটা অনেক বেশি জটিল। কোচ বদলানো মানেই শুধু কৌশলগত পরিবর্তন নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বড় অঙ্কের আর্থিক দায়। চুক্তি অনুযায়ী Emami Group-কে ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে, যা এই মুহূর্তে ক্লাব কর্তাদের জন্য একটি বড় সিদ্ধান্তের বিষয়। ফলে আবেগ নয়, বরং হিসেব-নিকেশ করেই এগোতে চাইছে ম্যানেজমেন্ট। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও বোর্ড মিটিং হয়নি বলে জানানো হয়েছে, তবুও কোচের সঙ্গে প্রতিদিনই আলোচনা চলছে—দলের সমস্যার জায়গা কোথায়, কেন হঠাৎ করে পারফরম্যান্সে এই পতন, আর কীভাবে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই আরও এক নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে ব্রুজোর সোশ্যাল মিডিয়া কার্যকলাপ। নিজের প্রোফাইল বায়ো থেকে ইস্টবেঙ্গলের নাম সরিয়ে ফেলেছেন তিনি—আর তাতেই জল্পনা তুঙ্গে। সমর্থকদের একাংশ মনে করছেন, হয়তো বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে, আবার অন্যরা এটাকে কোচের হতাশার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই ধরনের ছোট পরিবর্তনও বড় বার্তা বহন করে, বিশেষ করে যখন দল খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
তবে সমস্ত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন একটাই বিষয়—আগামী ম্যাচ। শনিবার Mohammedan SC-এর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই, যা শুধু তিন পয়েন্টের জন্য নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ফেরানোর লড়াই হিসেবেও দেখা হচ্ছে। Indian Super League-এ এখন পর্যন্ত পাঁচ ম্যাচ খেলে দু’টি জয়, দু’টি হার এবং একটি ড্র—এই মিশ্র পারফরম্যান্সে লিগ টেবিলের মাঝামাঝি জায়গায় রয়েছে ইস্টবেঙ্গল। অন্যদিকে মহামেডান চার ম্যাচেই হেরে তালিকার একেবারে তলানিতে। পরিসংখ্যান বলছে, এই ম্যাচে লাল-হলুদই এগিয়ে, কিন্তু ফুটবল তো কেবল সংখ্যার খেলা নয়—এখানে মানসিকতা, কৌশল আর মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সবকিছু বদলে দিতে পারে।
এই ম্যাচকে ঘিরে সমর্থকদের প্রত্যাশাও তুঙ্গে। তারা আবার দেখতে চান আগের সেই আগ্রাসী, আত্মবিশ্বাসী ইস্টবেঙ্গলকে—যারা মৌসুমের শুরুতে পরপর দুই ম্যাচ জিতে সকলকে চমকে দিয়েছিল। বিশেষ করে দলের আক্রমণভাগে Youssef Ezzejjari-এর মতো ফুটবলারের কাছ থেকে বড় ভূমিকা আশা করা হচ্ছে। তাঁর গোল করার ক্ষমতা এবং ফিনিশিং দক্ষতা যদি আবার জ্বলে ওঠে, তবে ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে সময় লাগবে না।
অন্যদিকে, কোচ ব্রুজোর মন্তব্যও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কেরালা ম্যাচের আগে তিনি বলেছিলেন, “ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষ আছেন, যারা দলের উন্নতি চান না।” এই মন্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই বিতর্কের ঝড় ওঠে। ক্লাব কর্তারা যদিও প্রকাশ্যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি, তবুও ভেতরে ভেতরে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। একটি দলের সাফল্যের জন্য কোচ, ম্যানেজমেন্ট এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে সুস্থ সম্পর্ক অত্যন্ত জরুরি—সেখানে এই ধরনের মন্তব্য সেই ভারসাম্যকে নড়বড়ে করে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের মধ্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে সমর্থকদের চাপ, অন্যদিকে ম্যানেজমেন্টের আর্থিক ও কৌশলগত হিসাব, আর মাঝখানে কোচ ও খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স—সবকিছু মিলিয়ে ইস্টবেঙ্গল শিবিরে এক অনিশ্চিত আবহ তৈরি হয়েছে। তবে ফুটবলের সৌন্দর্যই হল, একটি ম্যাচই সবকিছু বদলে দিতে পারে। যদি মহামেডানের বিরুদ্ধে জয়ে ফিরে আসতে পারে লাল-হলুদ, তাহলে হয়তো আবার নতুন করে শুরু হবে তাদের যাত্রা, আর কোচ ব্রুজোর উপর থেকেও চাপ কিছুটা কমবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই ম্যাচ কি ইস্টবেঙ্গলের জন্য টার্নিং পয়েন্ট হতে চলেছে, নাকি আরও গভীর সংকটে ঠেলে দেবে দলকে? উত্তর মিলবে মাঠেই। তবে একথা নিশ্চিত, এই ম্যাচ শুধু একটি সাধারণ লিগ ম্যাচ নয়; এটি সম্মান, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের লড়াই—যেখানে জয়ই একমাত্র ওষুধ।

