আইপিএল শুরুর আগেই বড় বদল! আসন্ন আইপিএল ২০২৬-কে সামনে রেখে কড়া ও সুসংগঠিত অনুশীলন নীতি চালু করল বিসিসিআই, যার মূল লক্ষ্য—ম্যাচের পিচ নিয়ে বিতর্ক কমানো এবং ‘হোম গ্রাউন্ড অ্যাডভান্টেজ’ কার্যত শূন্যে নামিয়ে আনা। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল, আয়োজক দলগুলি নিজেদের মাঠের পিচকে নিজেদের মতো করে তৈরি করে বাড়তি সুবিধা নিচ্ছে। এবার সেই পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে একগুচ্ছ কঠোর নির্দেশিকা জারি করেছে বোর্ড, যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হল ‘২১০ মিনিটের নিয়ম’ বা সাড়ে তিন ঘণ্টার অনুশীলন সীমা।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ফ্লাডলাইটের নিচে কোনও অনুশীলন ম্যাচ সর্বোচ্চ ২১০ মিনিট বা ৩ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের বেশি চলতে পারবে না। এই সময়সীমা নির্ধারণের পেছনে প্রধান কারণ হল পিচের অযথা ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা। আগে দলগুলি দীর্ঘ সময় ধরে ইন্ট্রা-স্কোয়াড ম্যাচ খেলত, যার ফলে ম্যাচের আগে থেকেই পিচের চরিত্র বদলে যেত। এখন সেই সুযোগ আর থাকবে না। বোর্ডের এই পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে—এবার থেকে আইপিএলে প্রতিটি দল সমান সুযোগ পাবে, মাঠের সুবিধা নিয়ে আর কোনও ‘গোপন খেলা’ চলবে না।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে পিচ ব্যবহারের ক্ষেত্রে। আগে যেখানে দলগুলি একই পিচ ভাগাভাগি করে অনুশীলন করত, এখন থেকে প্রত্যেক ম্যাচের জন্য আলাদা পিচে অনুশীলন করতে হবে। মূল ম্যাচের পিচ ম্যাচের অন্তত চার দিন আগে থেকে পুরোপুরি ‘নো-এন্ট্রি’ জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনও দলই সেই পিচে আগে থেকে অনুশীলন করতে পারবে না। প্রয়োজনে বিকল্প মাঠ বা প্র্যাকটিস এরিয়া তৈরি করতে হবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য ক্রিকেট সংস্থাগুলিকে, যেখানে শুধুমাত্র অনুশীলনই চলবে।
এছাড়া প্রতিটি দল সর্বাধিক দু’টি অনুশীলন ম্যাচ খেলতে পারবে এবং তার জন্য আগাম অনুমতি নিতে হবে বোর্ডের কাছ থেকে। এই ম্যাচগুলিও মূল পিচে নয়, বরং সাইড উইকেটে আয়োজন করতে হবে। এতে ম্যাচের পিচ অক্ষত থাকবে এবং প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা বজায় থাকবে। একইসঙ্গে প্রতিটি দলের জন্য আলাদা নেট প্র্যাকটিসের ব্যবস্থাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে কোনও দল অন্য দলের প্রস্তুতি বা কৌশল সম্পর্কে আগাম ধারণা না পায়।
নতুন নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, যদি কোনও দল তাদের নির্ধারিত সময়ের আগেই অনুশীলন শেষ করে ফেলে, তাহলেও তারা অতিরিক্ত সময় পিচ ব্যবহার করতে পারবে না। এমনকি থ্রো-ডাউন বা ব্যাটিং প্র্যাকটিসের সময়ও এক দলের নেট অন্য দল ব্যবহার করতে পারবে না। এই নিয়মগুলি মূলত প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্যই তৈরি করা হয়েছে, যাতে কোনও দল বাড়তি সুবিধা না পায়।
তবে ম্যাচের আগের দিন কিছুটা নমনীয়তা রাখা হয়েছে। বোর্ডের অনুমতি সাপেক্ষে দুই দল একই সময়ে অনুশীলন করতে পারবে, যাতে তারা ম্যাচের পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। এই ক্ষেত্রে প্রতিটি দলকে নির্দিষ্ট সময়—সাধারণত সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৮টা এবং রাত ৮টা থেকে ১০টা—দু’ঘণ্টা করে অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া হবে। এর ফলে শিশির বা রাতের আবহাওয়ার প্রভাব সম্পর্কে দুই দলই সমানভাবে ধারণা পাবে, যা ম্যাচের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
এছাড়াও আইপিএল ভেন্যুগুলিতে মূল পিচ ব্যবহারে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। হোম টিমগুলিকে মেডিক্যাল সাপোর্ট, নিরাপত্তা এবং ক্যাটারিং পরিষেবার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে অতিথি দল কোনও অসুবিধায় না পড়ে। অন্যদিকে অ্যাওয়ে দলকে শুধুমাত্র নিজেদের পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে হবে—এই নিয়মও নতুন করে যুক্ত হয়েছে নির্দেশিকায়।
বিসিসিআই-এর এই পাঁচ পাতার গাইডলাইন স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, আইপিএল ২০২৬-এ স্বচ্ছতা, সমতা এবং পেশাদারিত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পিচ বিতর্ক, হোম অ্যাডভান্টেজ বা গোপন কৌশলের বদলে এবার জোর দেওয়া হচ্ছে খেলোয়াড়দের দক্ষতা এবং মাঠের পারফরম্যান্সে। এই নতুন নিয়মগুলি কার্যকর হলে আইপিএল আরও প্রতিযোগিতামূলক, আকর্ষণীয় এবং ন্যায্য হয়ে উঠবে—এমনটাই মনে করছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।
ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছেও এই পরিবর্তন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে খেলার মান বাড়বে এবং প্রতিটি ম্যাচ হবে আরও অনিশ্চিত ও রোমাঞ্চকর। এখন দেখার বিষয়, দলগুলি কত দ্রুত এই নতুন নিয়মের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে এবং মাঠে তার প্রভাব কতটা পড়ে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—আইপিএলের ইতিহাসে এটি একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট, যা ভবিষ্যতের ক্রিকেট ব্যবস্থাপনাকেও নতুন দিশা দেখাতে পারে।

