৩১ মার্চ ডেডলাইন ঘনিয়ে আসতেই রেশন ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তনের বার্তা দিল কেন্দ্র—ই-কেওয়াইসি (e-KYC) সম্পূর্ণ করা এখন আর শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। গণবণ্টন ব্যবস্থায় (PDS) যাতে বিনামূল্যের খাদ্যশস্য প্রকৃত উপভোক্তার হাতেই পৌঁছায়, সেই লক্ষ্যেই কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রকের এই কড়া নির্দেশ। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ উঠছিল—ভুয়ো রেশন কার্ড, ডুপ্লিকেট নাম এবং অযোগ্য গ্রাহকদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য বেহাত হচ্ছে। তাই এবার প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করেই স্বচ্ছতা আনার পথে হাঁটছে কেন্দ্র। নির্দেশ অনুযায়ী, যেসব রাজ্যে এখনও রেশন গ্রাহকদের ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ হয়নি, তাদের ৩১ মার্চের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। শুধু তাই নয়, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ই-কেওয়াইসি যাচাই বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনও অনিয়ম মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।
সরকারি তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ রেশন গ্রাহকের ই-কেওয়াইসি সম্পন্ন হয়েছে, যা সংখ্যায় প্রায় ৬৯ কোটি ৭০ লক্ষ। কিন্তু লক্ষ্য ১০০ শতাংশ কভারেজ—অর্থাৎ একটিও গ্রাহক যেন বাদ না যায়। এই প্রক্রিয়ায় আধার নম্বর, বায়োমেট্রিক তথ্য (আঙুলের ছাপ), এবং মোবাইল নম্বরকে রেশন কার্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন গ্রাহক নিজেই এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারবেন তিনি কতটা রেশন পেলেন, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকেও সহজে নজরদারি করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা যেমন বাড়বে, তেমনই দুর্নীতির পথ অনেকটাই বন্ধ হবে বলে মনে করছে প্রশাসন।
এই উদ্যোগের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হল বিপুল আর্থিক ক্ষতি রোধ করা। কেন্দ্রের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ কোটি ৫১ লক্ষ ভুয়ো বা ডুপ্লিকেট রেশন কার্ড রয়েছে। এই ভুয়ো কার্ডগুলির মাধ্যমে সরকারি খাদ্যশস্য নিয়মিতভাবে পাচার হচ্ছে। সঠিকভাবে ই-কেওয়াইসি সম্পন্ন হলে এই জাল কার্ডগুলি চিহ্নিত করে বাতিল করা সম্ভব হবে, যার ফলে প্রায় ৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকার অপচয় রোধ করা যাবে। ফলে একদিকে যেমন প্রকৃত দরিদ্র মানুষ উপকৃত হবেন, অন্যদিকে সরকারের ভর্তুকির চাপও অনেকটাই কমবে।
তবে শুধু ভুয়ো কার্ড নয়, ‘অযোগ্য গ্রাহক’ নিয়েও কড়া হচ্ছে কেন্দ্র। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারী, আয়করদাতা, গাড়ির মালিক বা যাদের জিএসটি রেজিস্ট্রেশন রয়েছে, তারা বিনামূল্যের রেশনের আওতায় পড়েন না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই শ্রেণির বহু মানুষ এখনও রেশন সুবিধা নিচ্ছেন। তাই রাজ্যগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সক্রিয়ভাবে এই ধরনের গ্রাহকদের শনাক্ত করে তালিকা থেকে বাদ দিতে। এতে প্রকৃত দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ খাদ্যশস্য আরও সঠিকভাবে বণ্টন করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রেশন ডিলারদের মধ্যেও কিছুটা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ‘অল ইন্ডিয়া ফেয়ার প্রাইস শপ ডিলার্স ফেডারেশন’-এর সাধারণ সম্পাদক বিশ্বম্ভর বসু জানিয়েছেন, ডিলাররা সরকারের এই উদ্যোগে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, তবে তাদের বকেয়া কমিশন দ্রুত মেটানোর দাবিও তুলেছেন। কারণ, গ্রাহকদের ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ করাতে রেশন দোকানগুলিকেই প্রধান ভূমিকা নিতে হচ্ছে, যা অতিরিক্ত কাজের চাপ তৈরি করছে।
এই সমগ্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা (PMGKAY), যার মাধ্যমে দেশের প্রায় ৮০ কোটি দরিদ্র মানুষকে প্রতি মাসে জনপ্রতি ৫ কেজি করে চাল বা গম বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এত বড় একটি প্রকল্পে সামান্য অনিয়মও বিপুল ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই কেন্দ্র চাইছে, কোনওভাবেই যেন এই খাদ্যশস্য ভুল হাতে না যায়। ই-কেওয়াইসি বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে সেই লক্ষ্য পূরণে একধাপ এগোতে চায় সরকার।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে এই নির্দেশ কিছুটা ভিন্ন মাত্রা পায়। কারণ, জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের পাশাপাশি রাজ্য সরকার ‘খাদ্যসাথী’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় সব নাগরিককেই খাদ্যশস্য সরবরাহ করে। ফলে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের আওতায় কেউ বাদ পড়লেও রাজ্যস্তরে তারা খাদ্য পেয়ে থাকেন। তবুও ই-কেওয়াইসি বাধ্যতামূলক হওয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং তথ্যভাণ্ডার আরও নির্ভুল হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
৩১ মার্চের এই ডেডলাইন শুধু একটি প্রশাসনিক সময়সীমা নয়—এটি দেশের গণবণ্টন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দুর্নীতিমুক্ত করার এক বড় পদক্ষেপ। এখন দেখার, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজ্যগুলি কতটা সফলভাবে এই ই-কেওয়াইসি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে পারে এবং বাস্তবে কতটা কমে ভুয়ো রেশন কার্ডের দৌরাত্ম্য।

