Thu. Mar 19th, 2026

বাংলার রাজনীতিতে আবারও জোরদার চর্চার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), আর সেই আলোচনার মূলেই রয়েছেন দলীয় দুই গুরুত্বপূর্ণ মুখ—দিলীপ ঘোষ এবং হিরণ চট্টোপাধ্যায়। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক অন্দরে তুমুল জল্পনা, বিতর্ক এবং কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে খড়গপুর সদর কেন্দ্রকে ঘিরে এই উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। কারণ, গত নির্বাচনে জয়ী হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের নাম এবারের প্রার্থী তালিকায় নেই, বরং তাঁর জায়গায় ফেরানো হয়েছে দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষকে। এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে যেমন চমক সৃষ্টি করেছে, তেমনই সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও তৈরি করেছে নানা প্রশ্ন—এটি কি শুধুই কৌশলগত পরিবর্তন, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর রাজনৈতিক বার্তা?

গত কয়েক মাসে হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি। হঠাৎ করে দ্বিতীয় বিয়ে এবং তা ঘিরে আইনি জটিলতা, প্রথম পক্ষের স্ত্রী ও কন্যার অভিযোগ—সব মিলিয়ে তিনি সংবাদ শিরোনামে উঠে আসেন। অভিযোগ ওঠে, ডিভোর্স ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন তিনি, যা নিয়ে আইনি প্রশ্ন তো উঠেছেই, পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও তাঁর ভাবমূর্তিতে প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। এই পরিস্থিতিতে তাঁর প্রার্থী হওয়া নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। সেই জল্পনাতেই কার্যত সিলমোহর পড়ে যায় যখন বিজেপির প্রকাশিত প্রার্থী তালিকায় তাঁর নাম অনুপস্থিত দেখা যায়। ফলে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—এই বিতর্ক কি তাঁর টিকিট কাটা পড়ার অন্যতম কারণ?

অন্যদিকে, দিলীপ ঘোষের প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই বিজেপির ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে দেখছেন। একসময় খড়গপুর সদর থেকেই নিজের রাজনৈতিক ভিত শক্ত করেছিলেন তিনি। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে দলের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। যদিও ২০২১ সালে তাঁকে এই কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর জায়গায় আনা হয়েছিল হিরণকে। সেই সিদ্ধান্তে দলের অন্দরে ও কর্মীসমর্থকদের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলেও জানা যায়। কিন্তু ২০২৬-এর আগে বিজেপি যেন আবার দিলীপ ঘোষের উপর ভরসা রাখল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিজ্ঞতা, সংগঠন দক্ষতা এবং তৃণমূল স্তরে প্রভাব—এই তিনের সমন্বয়েই দিলীপ ঘোষকে আবার সামনে আনা হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দিলীপ ঘোষ নিজের স্বভাবসিদ্ধ ‘দাবাং’ ভঙ্গিতে একাধিক প্রশ্নের জবাব দেন। হিরণ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “কে কাকে বিয়ে করবে, সেটা নিয়ে মন্তব্য করা আমার কাজ নয়। আপনারা ওনার কাছেই জিজ্ঞেস করুন।” তবে দলের সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ আস্থাশীল। তাঁর কথায়, দল যে সিদ্ধান্ত নেয় তা ভেবেচিন্তেই নেয়, এবং সেই সিদ্ধান্তের পেছনে বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশল কাজ করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অতীতে অনেক নেতা-নেত্রীই সাময়িকভাবে সুযোগ না পেলেও পরে দলের তরফে সম্মানজনক দায়িত্ব পেয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি তুলে ধরেন রাহুল সিনহা-র নাম, যিনি একসময় দলের কোনও পদে না থাকলেও পরবর্তীতে রাজ্যসভায় মনোনীত হন।

খড়গপুর সদর কেন্দ্র নিয়ে দিলীপ ঘোষের আত্মবিশ্বাসও চোখে পড়ার মতো। তাঁর দাবি, গত কয়েকটি নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিজেপি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে থেকেছে এবং লোকসভা ভোটে প্রায় ৪৫ হাজার ভোটের লিড পেয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এবার লক্ষ্য আরও বড়—এক লক্ষ ভোটের ব্যবধান। তিনি জানান, স্থানীয় কর্মীরা ইতিমধ্যেই এই লক্ষ্য স্থির করেছেন এবং সেই অনুযায়ী সংগঠনকে মজবুত করার কাজ চলছে। বুধবার থেকেই তিনি পুরোদমে প্রচারে নামবেন বলেও ঘোষণা করেছেন, যা এই নির্বাচনী লড়াইকে আরও তীব্র করে তুলবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ শুধুমাত্র প্রার্থী পরিবর্তনের গল্প নয়, বরং এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা। একদিকে বিতর্কিত মুখকে সরিয়ে দেওয়া, অন্যদিকে অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য নেতাকে সামনে আনা—এই দুই কৌশল মিলিয়েই বিজেপি এবার নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে চাইছে। পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ বার্তাও স্পষ্ট—ব্যক্তিগত ইস্যু বা বিতর্ক দলের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে, এবং শেষ পর্যন্ত দলের আদর্শ ও কৌশলই প্রাধান্য পায়।

সব মিলিয়ে, খড়গপুর সদর কেন্দ্র এখন রাজ্যের অন্যতম ‘হটসিট’ হয়ে উঠেছে। দিলীপ ঘোষের প্রত্যাবর্তন, হিরণের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, এবং দলের কৌশলগত সিদ্ধান্ত—এই তিনের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এক উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসবে, এই কেন্দ্র ঘিরে নাটকীয়তা ও চর্চা যে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার বিষয়, মাঠের লড়াইয়ে কে শেষ হাসি হাসেন—অভিজ্ঞ নেতা নাকি নতুন সমীকরণ। তবে আপাতত একটাই স্পষ্ট, বাংলার নির্বাচনী রাজনীতি আবারও নতুন মোড় নিতে চলেছে।

By Sangbad Hate Bazare

“Sangbad Hate Bazare”—”News in the Marketplace”—is more than just a name. It is a commitment to bringing authentic, accessible, and people-centric journalism to the digital streets of Bengal and beyond. Inspired by the ethos of public discourse and open conversation, we present news that’s as diverse and dynamic as the society we serve. Operating under the digital identity “ehatebazare”, our platform is built for the Bengali-speaking global audience. Whether you are in Kolkata, Siliguri, Dhaka, London, or New York, if you speak Bengali, we are your home for news and insights.

Related Post

Leave a Reply