পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াল আর জি কর কাণ্ডকে কেন্দ্র করে৷ একদিকে শোক, অন্যদিকে ক্ষোভ – এই দুইয়ের মিশেলে তৈরি হওয়া আবেগ এখন যেন পরিণত হয়েছে ভোটের বড় ইসু্যতে৷ বহুদিন ধরে সুবিচারের দাবিতে সরব থাকা অভয়ার পরিবার হঠাৎ করেই নির্বাচনী ময়দানে নামার ঘোষণা করতেই শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক তরজা৷ আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-কে সামনে রেখে এই ঘটনাকে ঘিরে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে রাজ্যের ভোট রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা৷ অভয়ার মা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, শুধুমাত্র ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েই থেমে থাকতে চান না, বরং এবার সরাসরি রাজনৈতিক লড়াইয়ে নেমে সেই দাবি আরও জোরালো করতে চান৷ তাঁর এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে বিতর্কের ঝড়৷
অভয়ার মায়ের অভিযোগ, তাঁর মেয়ের জন্য প্রকৃত অর্থে কেউই রাস্তায় নেমে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন করেনি৷ বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে এই মর্মান্তিক ঘটনাকে ব্যবহার করেছে৷ এই বক্তব্য সামনে আসতেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেন বাম নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জী৷ উত্তরপাড়ার এই প্রার্থী স্পষ্ট ভাষায় প্রশ্ন তোলেন – একটি সংবেদনশীল ঘটনাকে ঘিরে কেন রাজনীতির মঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে? তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আবেগ এবং প্রতিবাদের মিশেল৷ তিনি বলেন, যেদিন আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেদিন কেউ জানত না অভয়া কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করতেন৷ কেউ জানতে চায়নি তিনি তৃণমূল না বিজেপি না সিপিএম – কারণ সেই সময় একটাই পরিচয় ছিল, তিনি একজন মেয়ে, একজন ডাক্তার, এবং একজন নাগরিক, যার জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্য৷
এই প্রসঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (Marxist)-এর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন মীনাক্ষী৷ তাঁর দাবি, প্রথম দিন থেকেই সিপিএম কর্মীরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছেন, প্রশাসনের গাডি় আটকে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন, এবং নিরপেক্ষভাবে বিচার চেয়েছেন৷ তাঁর মতে, এই লড়াই কোনও রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, বরং গোটা সমাজের নিরাপত্তার প্রশ্নে৷ বিশেষ করে যখন একজন মহিলা ডাক্তার কর্মস্থলে নিরাপদ নন, তখন তা গোটা রাজ্যের নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দেয়৷
অন্যদিকে, অভয়ার মা সরাসরি আঙুল তুলেছেন রাজ্যের শাসক দল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস এবং বাম শিবিরের দিকেও৷ তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও মেয়ের জন্য সুবিচার মেলেনি, আর এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী রাজনৈতিক টানাপোডে়ন এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা৷ একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, তাঁর পরিবারের যন্ত্রণা এবং ক্ষোভকে ব্যবহার করে বিভিন্ন দল নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে৷ এই প্রেক্ষাপটে তাঁর ভারতীয় জনতা পার্টির হয়ে নির্বাচনে লড়ার সিদ্ধান্তকে অনেকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেও দেখছেন৷
এই ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে মোহন ভাগবৎ-এর প্রসঙ্গ৷ মীনাক্ষী অভিযোগ করেন, রাজ্যে যখন একের পর এক দুর্নীতি, অপরাধ এবং নারীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব তৃণমূল সরকারের প্রতি নমনীয় অবস্থান নিয়েছে৷ তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, কারণ এতে রাজ্যের প্রধান দুই বিরোধী শক্তির সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠছে৷
পুরো ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট, আর জি কর কাণ্ড এখন আর শুধুমাত্র একটি অপরাধের তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয় নয় – এটি পরিণত হয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতীকে৷ একদিকে রয়েছে ন্যায়বিচারের দাবি, অন্যদিকে রয়েছে সেই দাবিকে ঘিরে গডে় ওঠা রাজনৈতিক মেরুকরণ৷ অভয়ার পরিবারের সিদ্ধান্ত এই মেরুকরণকে আরও তীব্র করেছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা৷ কারণ, সাধারণত যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির বাইরে থেকে ন্যায়বিচারের দাবি তোলেন, তাঁদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন তৈরি করে৷
তবে এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বাস্তবের কঠিন সত্য৷ যখন দীর্ঘ সময় ধরে কোনও ঘটনার সঠিক বিচার হয় না, তখন ভুক্তভোগী পরিবার নিজেদের কণ্ঠস্বর আরও শক্তিশালী করার পথ খোঁজে৷ অনেক সময় সেই পথ রাজনীতির ময়দানেই এসে মেলে৷ অভয়ার মায়ের ক্ষেত্রেও কি সেই একই বাস্তবতা কাজ করেছে, নাকি এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কৌশল – তা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করা কঠিন৷
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভোটের আগে আবেগের স্রোত তৈরি করার চেষ্টা চলছে৷ আবার অন্য অংশের মতে, এটি আসলে মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে সামনে আনার একটি বড় সুযোগ৷ ফলে এই ইসু্যতে কে কতটা লাভবান হবে, তা নির্ভর করবে জনমতের উপর৷
সব মিলিয়ে, আর জি কর ইসু্য এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দিয়েছে৷ অভয়ার পরিবারের রাজনৈতিক ময়দানে নামা, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের তীব্র প্রতিক্রিয়া, এবং বিভিন্ন দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ – সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে৷ আগামী দিনে এই ইসু্য কতটা প্রভাব ফেলবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এ, সেটাই এখন দেখার৷ তবে একটি বিষয় পরিষ্কার – ন্যায়বিচারের দাবি এবং রাজনীতির সমীকরণ, এই দুইয়ের সংঘর্ষেই তৈরি হচ্ছে বাংলার নতুন ভোটের কাহিনী৷

