Thu. Mar 19th, 2026

‘টাকার কাছে হারলাম’—প্রার্থী তালিকা ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ খগেশ্বর রায়ের

জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রকে ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরমহলে যে নাটকীয় রাজনৈতিক পালাবদল তৈরি হয়েছে, তা এখন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম চর্চিত বিষয়। টানা চারবারের বিধায়ক খগেশ্বর রায়-এর নাম প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ পড়তেই শুরু হয়েছে তীব্র ক্ষোভ, আবেগ এবং রাজনৈতিক জল্পনা। ২০০৯ সাল থেকে রাজগঞ্জ আসনে তাঁর জয়ের ধারা একপ্রকার ইতিহাস তৈরি করেছিল, ফলে এবারের নির্বাচনেও তিনিই প্রার্থী হবেন—এমনটাই ধরে নিয়েছিলেন স্থানীয় কর্মী-সমর্থক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল। কিন্তু আচমকাই দলীয় সিদ্ধান্তে বদলে যায় চিত্র, আর সেই জায়গায় প্রার্থী করা হয় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মন-কে। এই সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই রাজগঞ্জে তৃণমূলের সংগঠনের ভিত কেঁপে ওঠে, দেখা যায় একের পর এক পদত্যাগের ঢল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

খগেশ্বর রায়ের প্রতিক্রিয়া ছিল স্পষ্ট এবং আবেগঘন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লড়াই, দলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অবদান এবং উত্তরবঙ্গের তথাকথিত বাম দুর্গে প্রথম বড় ফাটল ধরানোর কৃতিত্ব তাঁর—এই সবকিছুর পরেও দল তাঁকে এইভাবে সরিয়ে দেবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে গভীর হতাশা—তিনি জানান, “দলের কাছ থেকে এই আঘাত প্রত্যাশা করিনি,” এবং আরও বলেন, “টাকার কাছে হেরে গেলাম।” এই মন্তব্য রাজনীতির অন্দরমহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যেখানে প্রার্থী নির্বাচনের পদ্ধতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। শুধু তিনিই নন, তাঁর অনুগামীদের মধ্যেও দেখা যায় তীব্র প্রতিক্রিয়া—রাজগঞ্জ ব্লক সভাপতি অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক নেতা পদত্যাগ করেন, যা দলীয় সংগঠনের জন্য বড় ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, নতুন প্রার্থী হিসেবে সামনে আসা স্বপ্না বর্মন পুরো বিষয়টিতে অত্যন্ত সংযত অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক পরিপক্বতার ছাপ স্পষ্ট—তিনি বলেন, “দিদি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটাই হবে। আমার কিছু বলার নেই।” এই ‘দিদি’ বলতে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সিদ্ধান্তকেই সমর্থন করছেন, যা দলের প্রতি তাঁর আনুগত্যের বার্তা দেয়। তবে একইসঙ্গে তিনি খগেশ্বর রায়কে নিয়ে কোনও বিতর্কে জড়াতে চাননি। বরং রাজনৈতিক সৌজন্য বজায় রেখে তিনি প্রাক্তন বিধায়কের কাছে আশীর্বাদ নিতে যান, যা পরিস্থিতিকে কিছুটা হলেও শান্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সাক্ষাৎ রাজনীতিতে সৌহার্দ্যের এক বিরল উদাহরণ হিসেবেও আলোচনায় এসেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস এবারে প্রার্থী তালিকায় বড়সড় পরিবর্তন এনে ‘নতুন মুখ’ এবং ‘তারকা প্রার্থী’-র উপর জোর দিয়েছে। সেই কৌশলেরই অংশ হিসেবে স্বপ্না বর্মনের মতো একজন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদকে রাজনীতির ময়দানে নামানো হয়েছে। এশিয়ান গেমসে স্বর্ণপদক জয়ী এই অ্যাথলিটের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছে দল। তবে এর ফলে পুরনো এবং অভিজ্ঞ নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়—রাজগঞ্জের ঘটনাই তার প্রমাণ।

এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, রাজনীতির আবেগ বনাম কৌশলগত সিদ্ধান্তের সংঘাত। একদিকে খগেশ্বর রায়ের মতো অভিজ্ঞ নেতার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও সংগঠন গড়ে তোলার অবদান, অন্যদিকে দলের ভবিষ্যৎ কৌশল হিসেবে নতুন মুখ তুলে ধরা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যে কোনও রাজনৈতিক দলের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। রাজগঞ্জে সেই ভারসাম্য আপাতত নড়বড়ে বলেই মনে হচ্ছে।

তবে শেষপর্যন্ত খগেশ্বর রায়ের প্রতিক্রিয়ায় কিছুটা নমনীয়তা দেখা যায়। স্বপ্না বর্মনের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি জানান, “টিকিট কাকে দেওয়া হবে, সেটা দলের সিদ্ধান্ত। ওর নতুন জীবন সফল হোক, সেই কামনা করি।” এই বক্তব্যে রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং দলীয় শৃঙ্খলার প্রতি সম্মান স্পষ্ট। যদিও তাঁর পদত্যাগের ঘোষণা এবং ক্ষোভ পুরোপুরি প্রশমিত হয়েছে কি না, তা সময়ই বলবে।

সব মিলিয়ে রাজগঞ্জের এই রাজনৈতিক নাটক শুধুমাত্র একটি প্রার্থী পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং এটি বর্তমান রাজনীতির এক বৃহত্তর চিত্র তুলে ধরে—যেখানে অভিজ্ঞতা বনাম নতুনত্ব, আবেগ বনাম কৌশল, এবং ব্যক্তিগত ক্ষোভ বনাম দলীয় সিদ্ধান্ত—এই সবকিছুর সংঘাত একসঙ্গে ফুটে উঠেছে। আগামী নির্বাচনে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে এখন থেকেই শুরু হয়েছে জোর জল্পনা। একদিকে স্বপ্না বর্মনের জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে খগেশ্বর রায়ের দীর্ঘদিনের সংগঠনভিত্তি—এই দুইয়ের লড়াইই ঠিক করে দেবে রাজগঞ্জের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ।

By Sangbad Hate Bazare

“Sangbad Hate Bazare”—”News in the Marketplace”—is more than just a name. It is a commitment to bringing authentic, accessible, and people-centric journalism to the digital streets of Bengal and beyond. Inspired by the ethos of public discourse and open conversation, we present news that’s as diverse and dynamic as the society we serve. Operating under the digital identity “ehatebazare”, our platform is built for the Bengali-speaking global audience. Whether you are in Kolkata, Siliguri, Dhaka, London, or New York, if you speak Bengali, we are your home for news and insights.

Related Post

Leave a Reply