Wed. Mar 25th, 2026

ভোটের আগে তীব্র আক্রমণ : মোদি-শাহকে ‘হাঁদা-ভোঁদা’ বললেন মমতা, বিজেপিকে কড়া হুঁশিয়ারি মমতার

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দান যতই উত্তপ্ত হচ্ছে, ততই তীব্র হচ্ছে শাসক-বিরোধী তরজা। ঠিক এমনই এক বিস্ফোরক পরিস্থিতিতে উত্তরবঙ্গের ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি ও ময়নাগুড়ির জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একের পর এক কড়া বার্তা দিয়ে রাজনৈতিক লড়াইকে নতুন মাত্রা দিলেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এল এনআরসি-র আশঙ্কা, ভোটার তালিকা বিতর্ক, কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ, উন্নয়নের খতিয়ান এবং সর্বোপরি মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি—যা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা।

প্রথমেই এনআরসি প্রসঙ্গে মুখ খুলে মমতার হুঙ্কার, “এবার এনআরসি করবে, কিন্তু আমি থাকতে ডিটেনশন ক্যাম্প করতে দেব না।” এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তিনি বিষয়টিকে শুধু প্রশাসনিক নয়, মানবিক ও রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবেই তুলে ধরতে চাইছেন। তাঁর অভিযোগ, এসআইআর-এর মাধ্যমে কেন্দ্র পরিকল্পিতভাবে মানুষকে হয়রানি করছে এবং এর পরেই এনআরসি চালুর চেষ্টা হতে পারে। তিনি সরাসরি বিজেপিকে নিশানা করে বলেন, “মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে অপমান করা হচ্ছে, এটা গণতন্ত্র নয়।”

ভোটার তালিকা নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে মমতা জানান, তিনি নিজেই নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে নিজের নাম খুঁজে পাননি। তাঁর দাবি, “ইচ্ছে করে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। শুনেছি ৮ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে, ১৯ লক্ষ নতুন নাম উঠেছে—কিন্তু সেই তালিকা কোথায়?” এই প্রশ্ন তুলে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়ানোর পাশাপাশি কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন, “একজনের নাম বাদ গেলেও আমরা চুপ করে বসে থাকব না।”

কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ আরও তীব্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কটাক্ষ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ‘হাঁদা-ভোঁদা দুই ভাই’ বলে। তাঁর অভিযোগ, “দেশ বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে, গ্যাসের দাম বাড়ছে, অথচ সাধারণ মানুষের কথা কেউ ভাবছে না।” তিনি আরও বলেন, সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও রাজবংশী সম্প্রদায়কে বেছে বেছে নোটিস দেওয়া হচ্ছে—যা স্পষ্টতই বিভাজনের রাজনীতি।

এদিকে বিজেপির দাবি—বাংলায় নাকি দুর্গাপুজো হয় না—এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেন মমতা। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন, “কত পুজো হয় এসে দেখে যান।” এর মাধ্যমে তিনি বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে রাজনৈতিক আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার বার্তা দেন।

উন্নয়নের প্রসঙ্গে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সরকারের ১৫ বছরের কাজের খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “কলেজ, ক্যান্সার হাসপাতাল, বিরসা অ্যাকাডেমি, মহাকাল মন্দির—সবকিছু আমরা করেছি।” উত্তরবঙ্গে উন্নয়নের জোয়ার এসেছে বলেও দাবি করেন তিনি। একইসঙ্গে বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে তারা বাংলা ভাগের ষড়যন্ত্র করছে। তাঁর কথায়, “উত্তরবঙ্গকে আলাদা রাজ্য করার চক্রান্ত চলছে, কিন্তু আমরা তা হতে দেব না।”

সম্প্রীতির বার্তা দিয়েও বিজেপিকে আক্রমণ করেন মমতা। তিনি বলেন, “আমরা একসঙ্গে দুর্গাপুজো করি, কালীপুজো করি, গুরু নানকের পুজো করি—আমরা সবাইকে নিয়ে চলি।” এর মাধ্যমে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার বার্তা দেন এবং বিজেপির বিরুদ্ধে মেরুকরণের অভিযোগ তোলেন।

সামাজিক প্রকল্পগুলোর প্রসঙ্গে এসে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বলেন, “বিজেপি এলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী—সব বন্ধ হয়ে যাবে।” তিনি দাবি করেন, তাঁর সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূরণ করেছে—যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে বিজেপিকে তিনি অভিযুক্ত করেন শুধু প্রতিশ্রুতি দেওয়া ও বিজ্ঞাপনে সীমাবদ্ধ থাকার জন্য।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হিসেবে উঠে আসে ‘দুয়ারে স্বাস্থ্য’ প্রকল্পের কথা। মমতা বলেন, “হাসপাতালে যেতে হবে না, বাড়ির কাছেই স্বাস্থ্য ক্যাম্প হবে, ডাক্তার-নার্সরা পরিষেবা দেবেন।” এই উদ্যোগকে তিনি মানুষের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার বড় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন।

চা শ্রমিকদের উদ্দেশেও আশ্বাস দিয়ে বলেন, “চা-বাগান খোলা রাখতে ও চা সুন্দরী প্রকল্প চালু রাখতে তৃণমূলকে ভোট দিন।” পাশাপাশি তিনি জানান, দুর্যোগের সময় তৃণমূল কর্মীরাই মানুষের পাশে থেকেছে—ঝড়, জল, বন্যায় রাত জেগে পাহারা দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় বাহিনী প্রসঙ্গেও মমতা একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেন। তিনি বলেন, “আমি সেন্ট্রাল ফোর্সকে সম্মান করি, আপনারা আপনাদের কাজ করুন, আমরা সহযোগিতা করব।” তবে একইসঙ্গে সতর্ক করে দেন, “যদি কেউ পক্ষপাতিত্ব করে, মানুষই তার জবাব দেবে।”

তাঁর রাজনৈতিক বার্তা ছিল স্পষ্ট—“বাংলা দখল করে দিল্লি দখল করব।” এই বক্তব্যে তিনি শুধু রাজ্য রাজনীতিতে নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও নিজের অবস্থান জোরালো করতে চান। তাঁর কথায়, “সব কেড়ে নিয়েছে, আমার হাতে শুধু মানুষ আছে”—এই লাইনেই যেন তাঁর পুরো রাজনৈতিক দর্শন ধরা পড়ে।

এই জনসভাগুলিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একদিকে যেমন বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন, তেমনি অন্যদিকে উন্নয়ন, সম্প্রীতি ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে নিজের সরকারের সাফল্য তুলে ধরেছেন। এনআরসি থেকে শুরু করে ভোটার তালিকা বিতর্ক—প্রতিটি ইস্যুকেই তিনি মানুষের আবেগের সঙ্গে যুক্ত করে রাজনৈতিক লড়াইকে আরও ধারালো করে তুলেছেন। আসন্ন নির্বাচনের আগে এই বার্তাগুলো যে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।

Related Post

Leave a Reply