দমদম বিমানবন্দরের ভিড়ভাট্টার মধ্যেই হঠাৎ করেই তৈরি হল এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ—আলিঙ্গনে জড়িয়ে পড়লেন হুমায়ুন কবীর এবং আসাদউদ্দিন ওয়েইসি, আর সেখান থেকেই কার্যত বাংলার রাজনীতিতে শুরু হল নতুন জোট-অধ্যায়ের কাউন্টডাউন। আম জনতা উন্নয়ন পার্টির কর্ণধার হুমায়ুন কবীর প্রকাশ্যেই ওয়েইসিকে ‘বড় ভাই’ বলে সম্বোধন করে জানিয়ে দিলেন, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল লড়বে মিম-এর সঙ্গে হাত মিলিয়েই। রাজনৈতিক মহলে আগে থেকেই এই জোট নিয়ে জল্পনা চলছিল, তবে বুধবার সকালে সাংবাদিক সম্মেলনে ওয়েইসিকে পাশে বসিয়ে সেই জল্পনায় সিলমোহর পড়তেই চর্চার পারদ চড়ে যায়। এই জোট যে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক বোঝাপড়া নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ভোট কৌশল—তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একাধিক ঘোষণায়। প্রথমত, ১ এপ্রিল থেকে রাজ্যজুড়ে যৌথ সভা শুরু করার ঘোষণা, যার সূচনা হবে ভরতপুর থেকে এবং সেখানে এক লক্ষ মানুষের জমায়েতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ—এই বার্তাই দিচ্ছে যে, সংগঠনের শক্তি প্রদর্শনই এখন মূল লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত, আসন বণ্টন ও প্রার্থী তালিকা নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ—১৮২টি আসনে লড়ার ঘোষণা, যার মধ্যে ইতিমধ্যেই ১৫৩ জন প্রার্থীর নাম প্রকাশ—এতে বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচনী ময়দানে নামার আগে নিজেদের সংগঠনকে কতটা শক্তিশালী করে তুলতে চাইছে এই জোট।
এই জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মুসলিম ভোটব্যাঙ্ককে কেন্দ্র করে কৌশলগত অবস্থান। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মুসলিম ভোট দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় ফ্যাক্টর, আর সেই ভোটে ভাগ বসাতেই কি এই নতুন সমীকরণ? হুমায়ুন কবীর আগেই বাবরি মসজিদ নির্মাণের প্রসঙ্গ তুলে রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছিলেন, যা স্পষ্টভাবে একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্ককে টার্গেট করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যুকে সামনে রেখে এবং মিম-এর মতো একটি সর্বভারতীয় মুসলিম মুখপাত্র দলকে পাশে নিয়ে তিনি ভোটের অঙ্ক আরও মজবুত করতে চাইছেন। মুর্শিদাবাদ জেলার রেজিনগর ও নওদা—দুটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র থেকে নিজে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা, সেই সঙ্গে জেলার ২২টি আসনের মধ্যে ১০টিতে প্রার্থী ঘোষণা—সব মিলিয়ে স্পষ্ট, নিজের ঘাঁটি শক্ত করেই তিনি বড় লড়াইয়ের দিকে এগোতে চাইছেন।
তবে এই জোট ঘিরে বিতর্কও কম নয়। বিরোধীদের একাংশ বরাবরই মিম-কে বিজেপির ‘বি টিম’ বলে কটাক্ষ করে এসেছে। সেই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে—এই জোট কি আদতে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরানোর কৌশল? নাকি বিজেপিকে পরোক্ষে সুবিধা করে দেওয়ার জন্যই এই সমীকরণ? রাজনৈতিক অন্দরে এই প্রশ্ন এখন তুঙ্গে। বিশেষ করে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরের মতো হাইভোল্টেজ কেন্দ্রে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত এই জোটকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। অনেকেই মনে করছেন, এইসব গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে লড়াই করে মূলত ভোট কেটে দেওয়াই লক্ষ্য হতে পারে। অন্যদিকে, হুমায়ুন কবীরের অনুগামীরা দাবি করছেন, এটি একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার চেষ্টা, যেখানে সাধারণ মানুষের উন্নয়নই মূল এজেন্ডা।
নিউটাউনের পাঁচতারা হোটেলে ওয়েইসির অবস্থান, তারপর যৌথ সাংবাদিক বৈঠক—সব কিছুই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এটি শুধু একটি জোট ঘোষণা নয়, বরং একটি শক্তিশালী বার্তা—বাংলার রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের সূচনা হতে পারে। মিম-কে কতগুলি আসন ছাড়া হবে, সেই নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও, আলোচনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এই আসন বণ্টনই শেষ পর্যন্ত জোটের শক্তি কতটা হবে, তা নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দমদমে ‘বড় ভাই’ ওয়েইসিকে জড়িয়ে ধরা সেই মুহূর্তটি এখন শুধু একটি আবেগঘন ছবি নয়, বরং বাংলার রাজনীতির এক সম্ভাব্য মোড়বদলের প্রতীক হয়ে উঠেছে। মুসলিম ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব বিস্তার, বিরোধী ভোটে বিভাজন, এবং নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করা—এই তিনটি লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এগোচ্ছে হুমায়ুন-মিম জোট। আগামী দিনে এই সমীকরণ কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে মাঠের লড়াই, প্রচারের তীব্রতা এবং ভোটারদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপর। তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিত—এই জোট বাংলার নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে, যা শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে যাবে, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।

