বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে এবার একাই ময়দানে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। আসন্ন West Bengal Assembly Election 2026-কে সামনে রেখে ‘হাত’ শিবিরে জোর কদমে চলছে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া, আর সেই তালিকায় চমকপ্রদ কিছু নাম ইতিমধ্যেই সামনে আসতে শুরু করেছে। সূত্রের খবর, আগামী এক থেকে দু’দিনের মধ্যেই প্রথম দফায় প্রায় ১০০টি আসনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করতে পারে কংগ্রেস নেতৃত্ব। গত নির্বাচনে বামেদের সঙ্গে জোট করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় এবার একক শক্তিতে লড়াই করে নিজেদের রাজনৈতিক জমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়েছে দল। সেই লক্ষ্য পূরণে অভিজ্ঞ নেতা থেকে শুরু করে তরুণ মুখ—সবাইকে মিলিয়েই এক নতুন ব্যালান্স তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যাচ্ছে, একাধিক হেভিওয়েট নেতার নাম ইতিমধ্যেই প্রায় চূড়ান্ত। প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছেন এবং তাঁকে বহরমপুর কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করার সম্ভাবনা প্রবল। পাশাপাশি বর্তমান প্রদেশ সভাপতি শুভঙ্কর সরকার-কেও প্রার্থী করা হচ্ছে—যদিও তাঁকে মালদহের কোনও আসন থেকে লড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে দলের একাংশ চাইছে তিনি তাঁর পুরনো ঘাঁটি শ্রীরামপুর থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুন। এই দ্বন্দ্বই প্রমাণ করছে, কংগ্রেস এবার প্রার্থী বাছাইয়ে কৌশলগত দিক থেকে কতটা সতর্কভাবে এগোচ্ছে।
এছাড়াও প্রার্থী তালিকায় উঠে আসছে আরও বেশ কিছু পরিচিত মুখ। প্রাক্তন সাংসদ মৌসম বেনজির নূর মালদহের কোনও আসন থেকে প্রার্থী হতে পারেন, এমন জল্পনা জোরদার হয়েছে। তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় জনসংযোগ এই ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইভাবে প্রাক্তন বিধায়ক নেপাল মাহাতো তাঁর পুরনো পুরুলিয়া আসন থেকেই ফের লড়াই করতে পারেন বলে খবর। উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মুখ আলি ইমরান রামজ (ভিক্টর)-এর নামও আলোচনায় রয়েছে—গোয়ালপোখর এবং চাকুলিয়া—এই দুই আসনের মধ্যে কোনও একটি থেকে তাঁকে প্রার্থী করা হতে পারে।
এই প্রার্থী তালিকার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল—তরুণ প্রজন্মকে গুরুত্ব দেওয়া। কংগ্রেস এবার ছাত্র-যুবদের মধ্য থেকে নতুন নেতৃত্ব তুলে আনতে চাইছে, যা দলের ভবিষ্যৎ সংগঠন গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ছাত্র পরিষদের রাজ্য সভানেত্রী প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী-র নাম হাওড়ার একটি আসনের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে। একইভাবে প্রাক্তন ছাত্রনেতা এবং বর্তমানে রাজ্য সাধারণ সম্পাদক আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়-কে কলকাতার রাসবিহারী কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করা হতে পারে। বর্ধমান, দিনাজপুর এবং মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলিতেও ছাত্র-যুবদের মধ্য থেকে একাধিক নতুন মুখকে সামনে আনার পরিকল্পনা করছে দল।
এদিকে, দিল্লিতে All India Congress Committee-র স্ক্রিনিং কমিটির বৈঠকে প্রার্থী তালিকা নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা চলছে। সোমবারই অধীররঞ্জন চৌধুরীকে দিল্লিতে তলব করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। কংগ্রেসের একটি বড় অংশ শুরুতে বামেদের সঙ্গে সম্ভাব্য জোটের কথা ভেবে বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রস্তুতি নিলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সমীকরণ বদলে গিয়েছে। ফলে অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী এখন নতুন করে নিজেদের অবস্থান পর্যালোচনা করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসের এই কৌশল—একদিকে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব, অন্যদিকে তরুণ মুখ—বাংলার ভোটে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, পুরুলিয়া, উত্তরবঙ্গের কিছু অংশে দল ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী, সেখানে সঠিক প্রার্থী নির্বাচনই হতে পারে তাদের সাফল্যের চাবিকাঠি। পাশাপাশি, স্থানীয় ইস্যু, ব্যক্তিগত জনসংযোগ এবং সাংগঠনিক শক্তি—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, কংগ্রেসের আসন্ন প্রার্থী তালিকা শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং এটি বাংলার রাজনীতিতে দলের পুনরুজ্জীবনের এক বড় পরীক্ষা। অধীর-মৌসম-শুভঙ্করদের মতো অভিজ্ঞ মুখের সঙ্গে তরুণ নেতৃত্বের মিশেল কতটা কার্যকর হয়, তা এখন দেখার বিষয়। তবে এতটুকু নিশ্চিত, এই তালিকা প্রকাশের পর রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় পরিবর্তন আসতে পারে এবং ভোটের লড়াই আরও জমে উঠবে।

