পুরীর মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা এক হারানো সভ্যতার গল্প যেন হঠাৎ করেই বাস্তবের আলোয় উঠে এসেছে—আর এই আবিষ্কার শুধু ইতিহাসপ্রেমী নয়, সাধারণ মানুষের মনেও এক অদ্ভুত শিহরণ জাগাচ্ছে। সম্প্রতি গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার (GPR) প্রযুক্তির সাহায্যে এমন কিছু তথ্য সামনে এসেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে—জগন্নাথ ধামের পবিত্র মাটির নিচে লুকিয়ে রয়েছে প্রায় এক হাজার বছরের পুরনো এক সম্পূর্ণ নগরী। বিষয়টি নিছক কোনো কিংবদন্তি নয়, বরং IIT গান্ধীনগরের বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা এই সম্ভাবনাকে জোরালোভাবে সামনে এনেছে। আর এই খবর আরও বেশি আবেগঘন হয়ে ওঠে যখন এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা—পুরী থেকে সদ্য ফেরা এক ভক্তের অনুভূতি, যিনি নিজেই উপলব্ধি করেছেন সেই মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের স্পন্দন।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২২ সালে, যখন শ্রীমন্দির পরিক্রমা প্রকল্পের আওতায় খননকার্য শুরু হয়। সেই সময় হঠাৎই মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে ভাঙা সিংহমূর্তি, প্রায় ৩০ ফুট দীর্ঘ একটি প্রাচীর এবং একটি প্রাচীন কক্ষের ধ্বংসাবশেষ—যার সবকিছুই প্রাচীন গঙ্গা রাজবংশের সময়কার বলে মনে করা হয়। এই আবিষ্কার স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল বাড়ায়, আর তারই পরিপ্রেক্ষিতে ওডিশা সরকার প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে IIT গান্ধীনগরকে দিয়ে পুরো এলাকায় GPR সমীক্ষা করায়। তবে আশ্চর্যের বিষয়, সেই গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট দীর্ঘদিন জনসমক্ষে আসেনি। অবশেষে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে আইনজীবী দিলীপ বারালের RTI আবেদনের মাধ্যমে সেই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসে, আর তাতেই সামনে আসে এক চমকপ্রদ চিত্র।
রিপোর্ট অনুযায়ী, মাটির মাত্র ২ থেকে ৩ মিটার নিচেই ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনার চিহ্ন। মোট ৪৩টি সম্ভাব্য ঐতিহ্যবাহী স্থানের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে রয়েছে এমার মঠ, নৃসিংহ মন্দির, বুঢ়ি-মা মন্দির এবং জগন্নাথ মন্দিরের আশেপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা। শুধু তাই নয়, ১৮টি ভূগর্ভস্থ নির্মাণ এখনও প্রায় অক্ষত অবস্থায় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে—যা প্রমাণ করে এই অঞ্চল একসময় একটি সুসংগঠিত এবং সমৃদ্ধ নগরী ছিল। আরও রহস্যজনক বিষয় হল একটি বিশাল সুড়ঙ্গের অস্তিত্বের ইঙ্গিত, যা সম্ভবত জগন্নাথ মন্দির থেকে সরাসরি বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। বহুদিন ধরেই মন্দিরের নিচে থাকা এক গুপ্তকক্ষের দরজা খুললে গর্জনের শব্দ শোনা যায় বলে প্রচলিত আছে—যাকে অনেকে ‘বাসুকির গর্জন’ বলে মনে করেন। এখন প্রশ্ন উঠছে, সেটি কি আসলে সমুদ্রের আওয়াজ? আর সেই গুপ্তকক্ষই কি সেই প্রাচীন সুড়ঙ্গের প্রবেশদ্বার? রহস্য আরও গভীর হচ্ছে যখন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে কিছু ধাতব বস্তু—সম্ভবত সোনা বা রুপার ইট—বিশেষ করে নৃসিংহ মন্দির সংলগ্ন এলাকায়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, জগন্নাথ মন্দিরের বাইরের প্রাচীর থেকে প্রায় ৭৫ মিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে এই প্রাচীন বসতির অস্তিত্বের চিহ্ন মিলেছে। অর্থাৎ, আজ যেখানে লক্ষ লক্ষ ভক্ত প্রতিদিন পা রাখেন, সেই মাটির ঠিক নিচেই হয়তো ঘুমিয়ে আছে একসময়ের ব্যস্ত শহর—যেখানে মানুষ বাস করত, পূজা করত, বাণিজ্য করত, হাসত-কাঁদত। এই উপলব্ধি একজন সাধারণ দর্শনার্থীর মনেও গভীর আবেগের সৃষ্টি করে। যে রাস্তায় হেঁটেছেন, যে মাটিতে দাঁড়িয়েছেন—সেই মাটির নিচে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস—এই ভাবনাই যেন এক অলৌকিক অনুভূতি এনে দেয়।
এই আবিষ্কার শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জগন্নাথ ধাম এতদিন শুধু ভক্তির কেন্দ্র হিসেবেই পরিচিত ছিল, কিন্তু এখন তা এক জীবন্ত ইতিহাসের দলিল হিসেবেও সামনে আসছে। পূর্ব গঙ্গা রাজবংশের সময়কার এই সম্ভাব্য নগরী যদি সম্পূর্ণরূপে আবিষ্কৃত হয়, তবে তা ভারতীয় ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনার সঙ্গে রয়েছে এক বড় আশঙ্কাও। ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন—যদি আধুনিক নির্মাণ কাজ একইভাবে চলতে থাকে, তবে এই অমূল্য ঐতিহাসিক সম্পদ চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন দ্রুত এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। ওডিশা সরকারের উচিত অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য শুরু করা, এবং সেই সঙ্গে পুরো GPR রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা, যাতে গবেষকরা আরও গভীরভাবে এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে পারেন। সবচেয়ে বড় ভয়—কোনো কায়েমী স্বার্থের কারণে যেন এই আবিষ্কার চাপা পড়ে না যায়।
এই মুহূর্তে পুরী যেন শুধু একটি তীর্থস্থান নয়, বরং এক বিশাল রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু। জগন্নাথ দেবের এই পবিত্র ভূমিতে আবার ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে জাগে—তবে এবার শুধু ভক্ত হিসেবে নয়, বরং একজন ইতিহাসের অনুসন্ধানী হিসেবে। কারণ, এই মাটির প্রতিটি স্তরে লুকিয়ে আছে অতীতের গল্প, যা আজ আমাদের সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে। আর সেই গল্পই হয়তো আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখাবে—আমাদের ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতি, আর আমাদের ঐতিহ্যের প্রকৃত গভীরতা কতটা বিস্তৃত।

