Site icon Sangbad Hate Bazare

১০ বছরেও মাটিতে মেশে না! সিগারেটের ফিল্টারেই লুকিয়ে পরিবেশের মারাত্মক ‘বিষ’

মাটিতে মিশতেই চায় না—একটি ছোট্ট সিগারেটের ফিল্টারই কীভাবে বছরের পর বছর পরিবেশের জন্য ভয়ংকর হুমকি হয়ে উঠতে পারে, তা নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে চমকে দেওয়ার মতো তথ্যসহ। প্রতিদিন রাস্তাঘাটে হাঁটতে গিয়ে আমরা প্রায়ই দেখি পোড়া সিগারেটের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে—কেউ গুরুত্ব দিই না, ভাবি এ তো সাধারণ আবর্জনা, কয়েক দিনের মধ্যেই নিশ্চয়ই মাটিতে মিশে যাবে। কিন্তু বাস্তবটা সম্পূর্ণ উল্টো। গবেষণা বলছে, এই সিগারেটের ফিল্টারগুলো খুব ধীরগতিতে পচে এবং ১০ বছর পরেও পরিবেশে বিষাক্ত প্রভাব ফেলতে থাকে। বিষয়টি বোঝার জন্য পয়েন্ট টু পয়েন্ট বিশ্লেষণ করলে চিত্রটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথমত, সিগারেটের ফিল্টারের পচন প্রক্রিয়া শুরু হয় খুব দ্রুত—ফেলে দেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এর বাইরের স্তর ভেঙে যেতে থাকে এবং কিছু অংশ মাটিতে মিশে যায়। কিন্তু এই দ্রুত পচন শুধুমাত্র প্রাথমিক স্তরেই সীমাবদ্ধ। এরপরই শুরু হয় সমস্যার মূল অংশ—পচনের গতি হঠাৎ করেই কমে যায়। ফলে ফিল্টারের ভেতরের গঠন বছরের পর বছর প্রায় একই অবস্থায় থেকে যায়।

দ্বিতীয়ত, এই ফিল্টারগুলির গঠনই তাদের দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মূল কারণ। এগুলি তৈরি হয় সেলুলোজ অ্যাসিটেট নামক এক ধরনের প্লাস্টিক পলিমার দিয়ে, যা সাধারণ জৈব পদার্থের মতো দ্রুত ভেঙে যায় না। রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি এই উপাদানটি এতটাই শক্তিশালী যে মাটিতে পড়ে থাকলেও এটি সম্পূর্ণভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে না। ফলে বছরের পর বছর ধরে এটি মাটিতে থেকে যায় এবং ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়।

তৃতীয়ত, এই গবেষণার বিশেষত্ব হল এর দীর্ঘ সময়কাল। আগে যেসব গবেষণা হয়েছিল, সেগুলি মূলত স্বল্পমেয়াদি—এক দিন, এক সপ্তাহ বা এক মাস ধরে ফেলে রাখা ফিল্টার নিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এই নতুন গবেষণাটি টানা ১০ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে ফিল্টারের গঠন বদলায় এবং তার প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

চতুর্থত, বিভিন্ন পরিবেশে ফিল্টারের পচনের হার ভিন্ন হয়। শহুরে এলাকায়, যেখানে মাটিতে জৈব পদার্থ কম, সেখানে পচন অত্যন্ত ধীরগতির। ১০ বছর পরেও প্রায় অর্ধেক ফিল্টার অক্ষত অবস্থায় থেকে যায়। অন্যদিকে, যেখানে মাটিতে জৈব উপাদান বেশি—যেমন বনাঞ্চল বা গাছপালায় ভরা এলাকা—সেখানে অণুজীবের সাহায্যে পচন তুলনামূলক দ্রুত হয়। তবুও সম্পূর্ণ ক্ষয় হয় না। অর্থাৎ, পরিবেশ যতই অনুকূল হোক না কেন, সিগারেটের ফিল্টার পুরোপুরি মাটিতে মিশে যেতে পারে না।

পঞ্চমত, গবেষণায় পরিসংখ্যানগত তথ্যও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। শহুরে এলাকায় ১০ বছর পরে মাত্র ৫২ শতাংশ পচন হয়েছে—অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক ফিল্টার তখনও টিকে রয়েছে। অন্যদিকে, জৈবপদার্থ সমৃদ্ধ মাটিতে প্রায় ৮৪ শতাংশ পচন হলেও কিছু অংশ এখনও অবশিষ্ট থাকে। এই অবশিষ্টাংশই ভবিষ্যতের দূষণের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে।

ষষ্ঠত, মাইক্রোপ্লাস্টিকের সমস্যা আরও ভয়ংকর। ফিল্টারগুলি যখন পুরোপুরি পচে না, তখন তা ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে মাটির মধ্যে থেকে যায়। এই মাইক্রোপ্লাস্টিক মাটির উর্বরতা কমায়, উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানুষের শরীরেও পৌঁছে যেতে পারে।

সপ্তমত, শুধু প্লাস্টিক দূষণই নয়—এই ফিল্টারগুলির মধ্যে লুকিয়ে থাকে মারাত্মক বিষাক্ত রাসায়নিক। সদ্য ফেলে দেওয়া ফিল্টার জলের সংস্পর্শে এলে তা থেকে নিকোটিন, অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ বেরিয়ে আসে। এগুলি জলজ প্রাণীর জন্য বিষের মতো কাজ করে এবং পুরো বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

অষ্টমত, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিষাক্ত উপাদানের পরিমাণ কিছুটা কমলেও তা কখনও পুরোপুরি বিলীন হয় না। অর্থাৎ, ১০ বছর পরেও এই ফিল্টারগুলি পরিবেশে বিষ ছড়াতে থাকে—যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

নবমত, গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে পরিবেশবিজ্ঞান বিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নালে, যা এই সমস্যার গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে। হাজার হাজার নমুনা বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন গবেষকেরা, যা এটিকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে।

দশমত, এই গবেষণা আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। প্রতিদিন কোটি কোটি সিগারেট খাওয়া হয় এবং তার অধিকাংশ ফিল্টারই অবহেলায় রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। এই অভ্যাসই ধীরে ধীরে পরিবেশকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সবশেষে বলা যায়, সিগারেটের ফিল্টার কোনো সাধারণ আবর্জনা নয়—এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ দূষণের উৎস। তাই এখনই সচেতন হওয়া জরুরি। ধূমপান কমানো, ফিল্টার নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা, এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারের মতো পদক্ষেপই পারে এই বিপদ থেকে আমাদের রক্ষা করতে। ছোট্ট একটি ফিল্টার—কিন্তু তার প্রভাব ভয়ংকরভাবে বড়। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি সচেতন হব, নাকি এই ‘নীরব দূষণ’কে আরও বাড়তে দেব?

Exit mobile version