লকডাউন নিয়ে জল্পনা-কল্পনা যখন দেশজুড়ে আতঙ্ক তৈরি করছে, ঠিক সেই সময়ই বড় ঘোষণা করে সমস্ত গুজবে জল ঢেলে দিল কেন্দ্র সরকার। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—ভারতে লকডাউন ফেরার কোনও পরিকল্পনাই নেই, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো খবর সম্পূর্ণ ভুয়ো ও ভিত্তিহীন। একই সঙ্গে তিনি পেট্রল ও ডিজ়েলের উপর লিটার প্রতি ১০ টাকা করে অন্তঃশুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তের বিস্তারিত ব্যাখ্যাও তুলে ধরেছেন, যা এখন দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের পকেট—দু’দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। এই দ্বৈত বার্তা—একদিকে স্বস্তি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কৌশল—নিয়ে এখন জোর চর্চা চলছে।
প্রথমেই লকডাউন প্রসঙ্গে পরিষ্কার বার্তা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “সরকার এমন কোনও পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে না যেখানে আবার লকডাউন জারি করতে হবে।” সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মহলে কোভিডের স্মৃতি, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও নানা গুজবের জেরে অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন যে আবারও হয়তো লকডাউন আসতে পারে। কিন্তু পুরীর এই মন্তব্যে সেই জল্পনায় কার্যত ইতি পড়েছে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের ভুয়ো খবর ছড়ানো থেকে বিরত থাকা উচিত এবং দেশবাসীর উচিত শান্ত থাকা ও দায়িত্বশীল আচরণ করা। অর্থাৎ, আতঙ্ক নয়—সচেতনতা ও স্থিরতাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন।
অন্যদিকে, পেট্রল ও ডিজ়েলের উপর অন্তঃশুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তটি কেন নেওয়া হল, সেটিও অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তিনি জানান, গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ভয়াবহভাবে বেড়েছে—ব্যারেল প্রতি প্রায় ৭০ ডলার থেকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২২ ডলারে। এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ, উত্তর আমেরিকায় প্রায় ৩০ শতাংশ, ইউরোপে ২০ শতাংশ এবং আফ্রিকায় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতও একই চাপের মুখে পড়তে পারত, এবং সাধারণ মানুষের পকেটে তার বড়সড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্র সরকারের সামনে মূলত দু’টি পথ খোলা ছিল—প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পেট্রল ও ডিজ়েলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া, যাতে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, সরকার নিজে আর্থিক চাপ নিয়ে সাধারণ মানুষকে মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা থেকে রক্ষা করা। সব দিক বিবেচনা করে সরকার দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছে। অর্থাৎ, জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পেট্রল ও ডিজ়েলের উপর লিটার প্রতি ১০ টাকা করে অন্তঃশুল্ক কমানো হয়েছে। ফলে পেট্রলের উপর শুল্ক ১৩ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ টাকায়, আর ডিজ়েলের ক্ষেত্রে তা সরাসরি শূন্যে নেমে এসেছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও তুলে ধরেছেন পুরী—এতে সরকারের রাজস্ব আয়ে বড়সড় প্রভাব পড়বে। অর্থাৎ, এই পদক্ষেপ সরকারের জন্য আর্থিকভাবে সহজ নয়, কিন্তু সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও অনেকের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এই শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে, যাতে দেশের বাজারে হঠাৎ করে জ্বালানির দাম লাফিয়ে না বাড়ে। ফলে আপাতত পেট্রল ও ডিজ়েলের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হচ্ছে।
একদিকে যেমন গুজবের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিতে চাইছে কেন্দ্র, অন্যদিকে তেমনি অর্থনৈতিক চাপ সামলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টাও করছে। লকডাউন নিয়ে ভয় বা বিভ্রান্তি দূর করার পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা—দুই দিকেই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে সরকারের পদক্ষেপে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির এবং বিশ্ব অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন এই ধরনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
লকডাউন নিয়ে গুজব একেবারেই ভিত্তিহীন—এ কথা যেমন স্পষ্ট, তেমনই পেট্রল-ডিজ়েলের অন্তঃশুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে সরকার আরও কী পদক্ষেপ নেয়। তবে আপাতত এই ঘোষণায় সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

