Site icon Sangbad Hate Bazare

সাবধান! ১২ আগস্ট, ২০২৬ পৃথিবী ৭ সেকেন্ডের জন্য মাধ্যাকর্ষণ হারাবে? NASA-র স্পষ্ট জবাব

সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি চাঞ্চল্যকর এবং বিতর্কিত দাবি দ্রুত ছডি়য়ে পডে়ছে – ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট পৃথিবী ঠিক ৭ সেকেন্ডের জন্য মাধ্যাকর্ষণ শক্তি হারাবে৷ ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব ও এক্স-সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এই তত্ত্বকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ভয়, কৌতূহল এবং তীব্র বিতর্ক৷ কিছু পোস্টে বলা হয়েছে, ‘NASA নাকি আগে থেকেই জানে এই ঘটনা ঘটবে, কিন্ত্ত সাধারণ মানুষকে সত্যটা জানানো হচ্ছে না৷’ আরও বিস্ফোরক দাবি – ‘Project Anchor’ নামে একটি গোপন মহাকাশ প্রকল্পের মাধ্যমে নাকি এই সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিজ্ঞানীরা৷ এমনও বলা হয়েছে যে ওই ৭ সেকেন্ডে পৃথিবীর সব মানুষ, গাডি়, বিমান, ভবনের জিনিসপত্র – সবকিছু কয়েক মিটার উপরে ভেসে উঠবে এবং মাধ্যাকর্ষণ ফিরে এলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে৷ কিছু পোস্ট তো সরাসরি দাবি করেছে যে, কোটি কোটি মানুষের মৃতু্য হতে পারে৷ কিন্ত্ত প্রশ্ন হচ্ছে – এই ভাইরাল দাবির পেছনে আদৌ কোনো বৈজ্ঞানিক সত্য আছে কি?

এই রহস্যময় তথ্যের সূত্র খুঁজতে গেলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের শেষ দিকে একটি সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিও থেকেই মূলত ব্যাপারটি ছড়াতে শুরু করে৷ সেই ভিডিওতে বলা হয়েছিল যে, ২০২৪ সালে একটি গোপন নথি ফাঁস হয়েছে যেখানে ‘Project Anchor’ নামের একটি NASA প্রকল্পের উল্লেখ রয়েছে৷ ওই নথি অনুযায়ী ১২ আগস্ট ২০২৬-এ পৃথিবীতে একটি ‘গ্র্যাভিটেশনাল অ্যানোমালি’ ঘটবে যা প্রায় ৭ সেকেন্ড স্থায়ী হবে৷ এই তত্ত্ব সমর্থকদের মতে, মহাকাশে দুটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ থেকে তৈরি হওয়া মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পৃথিবীর ওপর এমন প্রভাব ফেলবে যে অল্প সময়ের জন্য মাধ্যাকর্ষণ অদৃশ্য হয়ে যাবে৷ জানা গিয়েছিল এই বিপর্যয় মোকাবিলায় পৃথিবীর বহু সরকার নাকি ইতিমধ্যেই গোপনে নিরাপদ আশ্রয় বা বাঙ্কার তৈরি করছে৷

কিন্ত্ত বাস্তব বিজ্ঞানের জগতে এই দাবিকে একেবারেই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি৷ বিজ্ঞানী এবং মহাকাশ গবেষকরা একে ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলেই আখ্যা দিয়েছেন৷ NASA-র এক মুখপাত্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন – পৃথিবী ১২ আগস্ট ২০২৬-এ কিংবা অন্য কোনো দিনও ৭ সেকেন্ডের জন্য মাধ্যাকর্ষণ হারাবে না৷ কারণ মাধ্যাকর্ষণ কোনো সুইচের মতো নয়, যাকে হঠাৎ বন্ধ করা যায়৷ এটি একটি মৌলিক প্রাকৃতিক বল যা সরাসরি নির্ভর করে একটি গ্রহের ভরের ওপর৷ অর্থাৎ পৃথিবীর কেন্দ্র, ম্যান্টল, ভূত্বক, সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলসহ পুরো গ্রহের ভর কমে না গেলে তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও কমবে না৷ NASA আরও ব্যাখ্যা করেছে যে, ১২ আগস্ট ২০২৬-এ আসলে একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটবে, যা একটি স্বাভাবিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা৷ সূর্যগ্রহণের সময় সূর্য ও চাঁদের অবস্থান পৃথিবীর জোয়ার-ভাটায় কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্ত্ত পৃথিবীর মোট মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ওপর এর কোনো প্রভাব পডে় না৷ তাই সূর্যগ্রহণের সঙ্গে ‘গ্র্যাভিটি হারিয়ে যাওয়া’র কোনো সম্পর্ক নেই৷ এই গুজবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্ল্যাক হোল ও গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভের গল্প৷ সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু পোস্টে বলা হয়েছে, দুটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ থেকে আসা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পৃথিবীর ওপর এমন প্রভাব ফেলতে পারে যে মাধ্যাকর্ষণ সাময়িকভাবে অদৃশ্য হয়ে যাবে৷ কিন্ত্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাস্তবে ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ থেকে তৈরি হওয়া এই তরঙ্গ এতটাই ক্ষুদ্র যে তা শনাক্ত করতেই পৃথিবীতে অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্র ব্যবহার করতে হয়৷ এই তরঙ্গ মানুষের শরীর বা পৃথিবীর পরিবেশে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারে না৷ তাই এ ধরনের দাবি বিজ্ঞানসম্মত নয়৷ তবে এই ভাইরাল গল্পের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো ‘NASA সত্য লুকিয়ে রাখছে’ – এই অভিযোগ৷ ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীরা দাবি করেন, যদি ঘটনাটি সত্য না হয়, তাহলে কেন এত নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় উল্লেখ করা হয়েছে? আবার কেউ কেউ বলেন, বড় বড় মহাকাশ সংস্থা ও সরকার নাকি মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো এড়াতে সত্য গোপন করছে৷ কিন্ত্ত বাস্তবে কোনো বৈজ্ঞানিক নথি বা গবেষণায় ‘Project Anchor’ নামে কোনো প্রকল্পের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি৷ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ধারণাটি একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকেই তৈরি হয়েছে এবং পরে তা নানা প্ল্যাটফর্মে কপি-পেস্ট হয়ে ছডি়য়ে পডে়ছে৷ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা আসলে আধুনিক ডিজিটাল যুগে ভুয়া তথ্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য কত দ্রুত ছড়াতে পারে তার একটি বড় উদাহরণ৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন কোনো খবরকে রহস্যময়, ভয়াবহ বা গোপন তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন মানুষ সেটি যাচাই না করেই শেয়ার করে দেয়৷ ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি কাল্পনিক গল্প কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়৷ বিজ্ঞানীরা আরও একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন – যদি সত্যিই পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ কয়েক সেকেন্ডের জন্য হারিয়ে যেত, তাহলে শুধু মানুষ ভেসে উঠত না; সমুদ্রের জল, বায়ুমণ্ডল, কৃত্রিম উপগ্রহ এবং পুরো গ্রহের ভারসাম্যই ভেঙে পড়ত৷ এমনকি পৃথিবীর অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারত৷ অর্থাৎ এমন ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব এতটাই ভয়াবহ হতো যে পৃথিবী প্রায় ধ্বংসের মুখে চলে যেত৷ তাই বাস্তবে এই ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য৷ সবশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট নিয়ে যে আতঙ্ক ছড়ানো হয়েছে তা আসলে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য নয়, বরং একটি ভাইরাল ষড়যন্ত্র তত্ত্ব৷ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ সাত সেকেন্ডের জন্য হারিয়ে যাওয়ার গল্পটি যতই নাটকীয় শোনাক না কেন, বাস্তব বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ অসম্ভব৷ NASA এবং অন্যান্য মহাকাশ বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই এই দাবি স্পষ্টভাবে খারিজ করেছেন৷ তাই এই ধরনের চাঞ্চল্যকর খবর দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে বরং তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এবং নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক উৎসের ওপর ভরসা করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ৷

Exit mobile version