Site icon Sangbad Hate Bazare

মেরামতির জন্য ১২ ঘণ্টা বন্ধ দ্বিতীয় হুগলি সেতু, কোন পথে চলবে গাড়ি জানাল ট্রাফিক পুলিশ

রবিবার কলকাতা ও হাওড়ার যাত্রীদের জন্য বড় ট্রাফিক পরিবর্তনের ঘোষণা করা হয়েছে। শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেতু **দ্বিতীয় হুগলি সেতু বা বিদ্যাসাগর সেতু** আবারও ১২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখা হবে বলে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। কলকাতা পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, আগামী রবিবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই সেতু দিয়ে সমস্ত ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। মূলত সেতুর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতির কাজের জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সময়ে সেতুর বিয়ারিং, কেবল এবং অন্যান্য যান্ত্রিক কাঠামোর পরীক্ষা ও সংস্কার করা হবে। ফলে এই সময়ে যারা প্রতিদিন এই সেতু ব্যবহার করে কলকাতা থেকে হাওড়া বা হাওড়া থেকে কলকাতায় যাতায়াত করেন, তাঁদের বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।

কলকাতার পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকার এই মর্মে একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা জারি করেছেন। সেই নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, সেতুর নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। হুগলি রিভার ব্রিজেস কমিশনার্স (HRBC)-এর অধীনে থাকা এই সেতুর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশের প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং মেরামতি নির্দিষ্ট সময় অন্তর করা হয়। এবারও সেই রুটিন রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবেই এই কাজ করা হবে। সেতুর বিয়ারিং ও কেবলগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কারণ এগুলিই সেতুর ভারসাম্য ও স্থায়িত্ব বজায় রাখে। দীর্ঘদিন ব্যবহার ও ভারী যানবাহনের চাপের কারণে মাঝে মাঝে এগুলির পরীক্ষা ও সংস্কার করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তাই নাগরিকদের সাময়িক অসুবিধা হলেও সেতুর নিরাপত্তার স্বার্থে এই কাজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

এই ১২ ঘণ্টার জন্য সেতু বন্ধ থাকায় যাতে শহরের যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত না হয়, সেই কারণে আগেই বিকল্প রুট পরিকল্পনা করেছে কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ। নির্দেশিকা অনুযায়ী, জিরাট আইল্যান্ড থেকে এজেসি বোস রোড ধরে যে সমস্ত গাড়ি আসবে, সেগুলিকে টার্ফ ভিউ রোডের মাধ্যমে হেস্টিংস ক্রসিংয়ের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে। সেখান থেকে সেন্ট জর্জেস গেট রোড ও স্ট্র্যান্ড রোড হয়ে ওই সব গাড়ি হাওড়া ব্রিজের দিকে যেতে পারবে। এই রুট ব্যবহার করে চালকরা সহজেই হাওড়া ব্রিজে পৌঁছে গন্তব্যে যেতে পারবেন। এছাড়া হেস্টিংস ক্রসিং থেকে ডানদিকে ঘুরে কেপি রোডের দিকেও যাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যাতে যানবাহনের চাপ বিভিন্ন রাস্তায় ভাগ হয়ে যায়।

একইভাবে জেএন আইল্যান্ডের দিক থেকে কেপি রোড ধরে যে গাড়িগুলি আসবে, সেগুলিকেও ১১ ফার্লং গেটের মাধ্যমে হেস্টিংস ক্রসিংয়ের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে। এর ফলে বিদ্যাসাগর সেতু বন্ধ থাকলেও গাড়িগুলি বিকল্প পথে সহজেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছতে পারবে। আবার সিজিআর রোড দিয়ে খিদিরপুরের দিক থেকে আসা যানবাহনগুলিকে হেস্টিংস ক্রসিংয়ে পৌঁছে বাঁদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে যাতে তারা অন্য রুট ধরে গন্তব্যে যেতে পারে।

ট্রাফিক পুলিশের পরিকল্পনা অনুযায়ী কেপি রোড দিয়ে আসা সমস্ত গাড়িকে ওয়াই পয়েন্টের মাধ্যমে ১১ ফার্লং গেটের দিকে পাঠানো হবে। সেখান থেকে রেড রোড ধরে হাওড়া ব্রিজে পৌঁছনো যাবে। এই রুটটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে করে শহরের কেন্দ্রীয় অংশে যানজট কমানো সম্ভব হবে। পুলিশ প্রশাসন আগাম সতর্ক করে দিয়েছে যে, রবিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই বিকল্প ট্রাফিক পরিকল্পনা কার্যকর থাকবে এবং চালকদের সেই অনুযায়ী গাড়ি চালানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

বিদ্যাসাগর সেতু কলকাতা ও হাওড়ার মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি এই সেতু ব্যবহার করে। অফিসগামী মানুষ, পণ্যবাহী ট্রাক, বাস, ট্যাক্সি—সব মিলিয়ে এই সেতুর উপর দিয়ে প্রচুর যানবাহন চলাচল করে। তাই সামান্য সময়ের জন্য সেতু বন্ধ থাকলেও শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থায় বড় প্রভাব পড়তে পারে। সেই কারণেই কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ আগে থেকেই বিস্তারিত পরিকল্পনা করে বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা করেছে যাতে সাধারণ মানুষের অসুবিধা যতটা সম্ভব কম হয়।

দ্বিতীয় হুগলি সেতু বা বিদ্যাসাগর সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে হুগলি রিভার ব্রিজেস কমিশনার্স (HRBC)। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই স্বশাসিত সংস্থাটি ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। হুগলি নদীর উপর সেতু নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেতুগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই সংস্থার মূল দায়িত্ব। বিদ্যাসাগর সেতু ছাড়াও হুগলি নদীর উপর নির্মিত অন্যান্য সেতুর দেখভালও করে এই সংস্থা। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেতুগুলির নিয়মিত পরীক্ষা ও মেরামতি করা হয় যাতে সেগুলি দীর্ঘদিন নিরাপদভাবে ব্যবহার করা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক কেবল-স্টেইড সেতুর ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল, বিয়ারিং, ডেক এবং অন্যান্য যান্ত্রিক অংশগুলি নিয়মিত পরীক্ষা না করলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই এই ধরনের পরিকল্পিত মেরামতি কাজ সেতুর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত জরুরি।

পুলিশ প্রশাসন শহরবাসীকে অনুরোধ করেছে যে, রবিবার যাঁদের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এই রুটে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে তাঁরা যেন সম্ভব হলে অন্য সময় যাতায়াত করেন। এছাড়া গাড়ি চালানোর সময় ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশ মেনে চলার কথাও বলা হয়েছে। এতে করে শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং অযথা যানজট এড়ানো যাবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বিদ্যাসাগর সেতু ১২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ থাকলেও কলকাতা পুলিশের বিকল্প ট্রাফিক পরিকল্পনার ফলে শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। নাগরিকদের সহযোগিতা থাকলে এই সাময়িক পরিবর্তনের মধ্যেও শহরের যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। রবিবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই নিয়ম কার্যকর থাকবে এবং কাজ শেষ হলে আবার স্বাভাবিকভাবে সেতু দিয়ে যান চলাচল শুরু হবে। শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে নাগরিকদের জন্যই উপকার বয়ে আনবে।

Exit mobile version