Thu. Mar 19th, 2026

‘উজ্জ্বলা যোজনা’ কি এখন শুধুই কাগজে? গ্যাসের দাম বাড়তেই ধোঁয়ায় ভরছে গ্রামীণ রান্নাঘর

ভারতের দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মহিলাদের জীবনে পরিষ্কার জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল ‘প্রধান মন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা’৷ লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ ও প্রান্তিক পরিবারের রান্নাঘরকে ধোঁয়ামুক্ত করা এবং কাঠ-খডি়র চুলা থেকে মুক্তি দিয়ে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করা৷ কিন্ত্ত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্বপ্নের বাস্তবতা অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে৷ কাগজে-কলমে লক্ষ লক্ষ পরিবার গ্যাস সংযোগ পেলেও বাস্তবে ক্রমবর্ধমান এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সেই সংযোগকে কার্যত অচল করে তুলছে৷ ২০২০ সালে যেখানে একটি রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ছিল প্রায় ৭০০ টাকার কাছাকাছি, সেখানে বর্তমানে অনেক সময় সেই দাম হাজার টাকা বা তারও বেশি ছু‌েঁয়ছে৷ ফলে বহু পরিবার, বিশেষ করে ‘উজ্জ্বলা যোজনা’-র সুবিধাভোগীরা, গ্যাস সংযোগ থাকা সত্ত্বেও সিলিন্ডার রিফিল করতে পারছেন না৷ একজন দিনমজুরের পরিবারের মাসিক আয় যদি পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে একটি সিলিন্ডারের দাম মানে পরিবারের কয়েক দিনের খাবারের বাজেট৷ তাই গ্যাসের দাম বাড়া মানে শুধু একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয় – এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্যগত সংকটের সূচনা৷

এই সংকটের পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির জটিল সম্পর্ক৷ বিশেষ করে ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ’ শুরু হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পডে়ছে এলপিজির দামে৷ রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ৷ যুদ্ধের ফলে পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞা, সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং ইউরোপের বিকল্প জ্বালানির খোঁজ আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের চাহিদা বাডি়য়ে দেয়৷ এর ফলে এলপিজির আন্তর্জাতিক মূল্য বেডে় যায় এবং ভারতসহ বহু আমদানিনির্ভর দেশের খরচ বাড়তে থাকে৷ আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে ‘সাউদি আরামকো-র ‘কনট্র্যাক্ট প্রাইস’ বা ‘সি-পি রেট’৷ এই রেট বেডে় গেলে ভারতের তেল বিপণন সংস্থাগুলোর আমদানি ব্যয়ও বেডে় যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি বোঝা এসে পডে় সাধারণ গ্রাহকের উপর৷

তবে শুধু ইউক্রেন যুদ্ধই নয়, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাতও জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে৷ বিশেষ করে ‘ইসরাইল – হামাস যুদ্ধ’ এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিবহণ ব্যয় বেডে় গেছে৷ বহু জাহাজকে নিরাপত্তাজনিত কারণে ‘সুয়েজ ক্যানাল’ এডি়য়ে আফ্রিকার দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে৷ এতে সময় ও খরচ উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ এই বাড়তি পরিবহণ ব্যয়ও শেষ পর্যন্ত গ্যাসের দামে প্রভাব ফেলছে৷ ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অস্থিরতা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের ভারতের গ্রামীণ রান্নাঘরেও এসে পৌঁছাচ্ছে৷

গ্যাসের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রামের রান্নার অভ্যাসে৷ বহু পরিবার আবার ফিরে যাচ্ছে কাঠ, কয়লা, খড় বা গোবরের ঘুঁটের চুলায়৷ অর্থনৈতিকভাবে এটি হয়তো স্বল্পমেয়াদে সস্তা মনে হতে পারে, কিন্ত্ত দীর্ঘমেয়াদে এটি ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে৷ রান্নাঘরের ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট ঘরের ভিতরের বায়ুদূষণ বহু রোগের কারণ হতে পারে৷ বিশেষ করে ফুসফুসের রোগ, চোখ জ্বালা, শ্বাসকষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসনালির সমস্যা দেখা দেয়৷ বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য গবেষণায় দেখা গেছে যে ঘরের ভিতরের বায়ুদূষণ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে নারী ও শিশুদের জন্য একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি৷ এই বিষয়ে বহু সতর্কবার্তা দিয়েছে ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ্ অরগানাইজেশন’৷ তাদের হিসাব অনুযায়ী, ঘরের ভিতরের বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃতু্য ঘটে, যার বড় অংশই নারী ও শিশু৷

ভারতের সামাজিক কাঠামোতেও এই সমস্যার গভীর প্রভাব রয়েছে৷ দেশের অধিকাংশ পরিবারে রান্নার দায়িত্ব এখনও মূলত মহিলাদের উপরেই বর্তায়৷ পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের ৬০ শতাংশেরও বেশি পরিবারে রান্নাঘরের প্রধান দায়িত্ব মহিলাদের৷ কিন্ত্ত রান্নার জ্বালানি কেনা বা পরিবারের বাজেট নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনেক সময় তাদের মতামত গুরুত্ব পায় না৷ ফলে গ্যাসের দাম বাড়লে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পডে় মহিলাদের জীবনযাত্রায়৷ গ্যাসের অভাবে তাদের আবার ভোরবেলা উঠে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে হয়, ধোঁয়াভরা রান্নাঘরে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাডে়৷ অনেক ক্ষেত্রে রান্নার সময় কমে যাওয়ায় খাবারের মানও খারাপ হয়, যা শিশুদের পুষ্টির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে৷

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্যাসের দাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে৷ নির্বাচনের আগে প্রায়ই ভরতুকি বাড়ানো বা দাম কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়, কিন্ত্ত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারভিত্তিক মূল্যনীতির কারণে দাম আবার বেডে় যায়৷ আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে দেশীয় মূল্য সংযুক্ত থাকার ফলে সাধারণ মানুষ প্রায়ই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে পারেন না৷ ভর্তুকি থাকলেও তা সবসময় প্রত্যেক সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছায় না৷ ফলে কাগজে গ্যাস সংযোগ থাকলেও বাস্তবে সেই সংযোগ ব্যবহার করা সম্ভব হয় না৷

এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য গ্যাস ভরতুকি আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া দরকার৷ একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থাও বাড়ানো যেতে পারে – যেমন বায়োগ্যাস বা সৌরশক্তি নির্ভর রান্নার প্রযুক্তি৷ তবে বাস্তবে এই প্রযুক্তিগুলির ব্যবহার বাড়াতে প্রাথমিক বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে৷ গ্রামীণ এলাকায় পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনাও দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে৷

সবশেষে বলা যায়, গ্যাসের দাম বাড়া শুধু অর্থনীতির একটি সাধারণ ঘটনা নয় – এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের কোটি কোটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে৷ বিশেষ করে গ্রামীণ মহিলাদের জন্য এটি একটি নীরব সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছে৷ আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং দেশের অর্থনৈতিক নীতির প্রভাব শেষ পর্যন্ত এসে পড়ছে রান্নাঘরের চুলার সামনে দাঁডি়য়ে থাকা সেই গৃহিণীর উপর৷ তাই পরিষ্কার, নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী রান্নার জ্বালানি নিশ্চিত করা শুধু একটি উন্নয়নমূলক প্রকল্প নয় – এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও জনস্বাস্থ্যের একটি মৌলিক প্রশ্ন৷ যতদিন না দেশের প্রতিটি পরিবার সহজে গ্যাস ব্যবহার করতে পারে, ততদিন পর্যন্ত ‘উজ্জ্বলা যোজনা’-র প্রকৃত লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলা কঠিন৷

By Sangbad Hate Bazare

“Sangbad Hate Bazare”—”News in the Marketplace”—is more than just a name. It is a commitment to bringing authentic, accessible, and people-centric journalism to the digital streets of Bengal and beyond. Inspired by the ethos of public discourse and open conversation, we present news that’s as diverse and dynamic as the society we serve. Operating under the digital identity “ehatebazare”, our platform is built for the Bengali-speaking global audience. Whether you are in Kolkata, Siliguri, Dhaka, London, or New York, if you speak Bengali, we are your home for news and insights.

Related Post

Leave a Reply