Site icon Sangbad Hate Bazare

‘উজ্জ্বলা যোজনা’ কি এখন শুধুই কাগজে? গ্যাসের দাম বাড়তেই ধোঁয়ায় ভরছে গ্রামীণ রান্নাঘর

ভারতের দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মহিলাদের জীবনে পরিষ্কার জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল ‘প্রধান মন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা’৷ লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ ও প্রান্তিক পরিবারের রান্নাঘরকে ধোঁয়ামুক্ত করা এবং কাঠ-খডি়র চুলা থেকে মুক্তি দিয়ে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করা৷ কিন্ত্ত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্বপ্নের বাস্তবতা অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে৷ কাগজে-কলমে লক্ষ লক্ষ পরিবার গ্যাস সংযোগ পেলেও বাস্তবে ক্রমবর্ধমান এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সেই সংযোগকে কার্যত অচল করে তুলছে৷ ২০২০ সালে যেখানে একটি রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ছিল প্রায় ৭০০ টাকার কাছাকাছি, সেখানে বর্তমানে অনেক সময় সেই দাম হাজার টাকা বা তারও বেশি ছু‌েঁয়ছে৷ ফলে বহু পরিবার, বিশেষ করে ‘উজ্জ্বলা যোজনা’-র সুবিধাভোগীরা, গ্যাস সংযোগ থাকা সত্ত্বেও সিলিন্ডার রিফিল করতে পারছেন না৷ একজন দিনমজুরের পরিবারের মাসিক আয় যদি পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে একটি সিলিন্ডারের দাম মানে পরিবারের কয়েক দিনের খাবারের বাজেট৷ তাই গ্যাসের দাম বাড়া মানে শুধু একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয় – এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্যগত সংকটের সূচনা৷

এই সংকটের পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির জটিল সম্পর্ক৷ বিশেষ করে ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ’ শুরু হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পডে়ছে এলপিজির দামে৷ রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ৷ যুদ্ধের ফলে পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞা, সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং ইউরোপের বিকল্প জ্বালানির খোঁজ আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের চাহিদা বাডি়য়ে দেয়৷ এর ফলে এলপিজির আন্তর্জাতিক মূল্য বেডে় যায় এবং ভারতসহ বহু আমদানিনির্ভর দেশের খরচ বাড়তে থাকে৷ আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে ‘সাউদি আরামকো-র ‘কনট্র্যাক্ট প্রাইস’ বা ‘সি-পি রেট’৷ এই রেট বেডে় গেলে ভারতের তেল বিপণন সংস্থাগুলোর আমদানি ব্যয়ও বেডে় যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি বোঝা এসে পডে় সাধারণ গ্রাহকের উপর৷

তবে শুধু ইউক্রেন যুদ্ধই নয়, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাতও জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে৷ বিশেষ করে ‘ইসরাইল – হামাস যুদ্ধ’ এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিবহণ ব্যয় বেডে় গেছে৷ বহু জাহাজকে নিরাপত্তাজনিত কারণে ‘সুয়েজ ক্যানাল’ এডি়য়ে আফ্রিকার দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে৷ এতে সময় ও খরচ উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ এই বাড়তি পরিবহণ ব্যয়ও শেষ পর্যন্ত গ্যাসের দামে প্রভাব ফেলছে৷ ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অস্থিরতা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের ভারতের গ্রামীণ রান্নাঘরেও এসে পৌঁছাচ্ছে৷

গ্যাসের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রামের রান্নার অভ্যাসে৷ বহু পরিবার আবার ফিরে যাচ্ছে কাঠ, কয়লা, খড় বা গোবরের ঘুঁটের চুলায়৷ অর্থনৈতিকভাবে এটি হয়তো স্বল্পমেয়াদে সস্তা মনে হতে পারে, কিন্ত্ত দীর্ঘমেয়াদে এটি ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে৷ রান্নাঘরের ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট ঘরের ভিতরের বায়ুদূষণ বহু রোগের কারণ হতে পারে৷ বিশেষ করে ফুসফুসের রোগ, চোখ জ্বালা, শ্বাসকষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসনালির সমস্যা দেখা দেয়৷ বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য গবেষণায় দেখা গেছে যে ঘরের ভিতরের বায়ুদূষণ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে নারী ও শিশুদের জন্য একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি৷ এই বিষয়ে বহু সতর্কবার্তা দিয়েছে ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ্ অরগানাইজেশন’৷ তাদের হিসাব অনুযায়ী, ঘরের ভিতরের বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃতু্য ঘটে, যার বড় অংশই নারী ও শিশু৷

ভারতের সামাজিক কাঠামোতেও এই সমস্যার গভীর প্রভাব রয়েছে৷ দেশের অধিকাংশ পরিবারে রান্নার দায়িত্ব এখনও মূলত মহিলাদের উপরেই বর্তায়৷ পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের ৬০ শতাংশেরও বেশি পরিবারে রান্নাঘরের প্রধান দায়িত্ব মহিলাদের৷ কিন্ত্ত রান্নার জ্বালানি কেনা বা পরিবারের বাজেট নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনেক সময় তাদের মতামত গুরুত্ব পায় না৷ ফলে গ্যাসের দাম বাড়লে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পডে় মহিলাদের জীবনযাত্রায়৷ গ্যাসের অভাবে তাদের আবার ভোরবেলা উঠে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে হয়, ধোঁয়াভরা রান্নাঘরে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাডে়৷ অনেক ক্ষেত্রে রান্নার সময় কমে যাওয়ায় খাবারের মানও খারাপ হয়, যা শিশুদের পুষ্টির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে৷

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্যাসের দাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে৷ নির্বাচনের আগে প্রায়ই ভরতুকি বাড়ানো বা দাম কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়, কিন্ত্ত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারভিত্তিক মূল্যনীতির কারণে দাম আবার বেডে় যায়৷ আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে দেশীয় মূল্য সংযুক্ত থাকার ফলে সাধারণ মানুষ প্রায়ই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে পারেন না৷ ভর্তুকি থাকলেও তা সবসময় প্রত্যেক সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছায় না৷ ফলে কাগজে গ্যাস সংযোগ থাকলেও বাস্তবে সেই সংযোগ ব্যবহার করা সম্ভব হয় না৷

এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য গ্যাস ভরতুকি আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া দরকার৷ একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থাও বাড়ানো যেতে পারে – যেমন বায়োগ্যাস বা সৌরশক্তি নির্ভর রান্নার প্রযুক্তি৷ তবে বাস্তবে এই প্রযুক্তিগুলির ব্যবহার বাড়াতে প্রাথমিক বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে৷ গ্রামীণ এলাকায় পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনাও দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে৷

সবশেষে বলা যায়, গ্যাসের দাম বাড়া শুধু অর্থনীতির একটি সাধারণ ঘটনা নয় – এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের কোটি কোটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে৷ বিশেষ করে গ্রামীণ মহিলাদের জন্য এটি একটি নীরব সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছে৷ আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং দেশের অর্থনৈতিক নীতির প্রভাব শেষ পর্যন্ত এসে পড়ছে রান্নাঘরের চুলার সামনে দাঁডি়য়ে থাকা সেই গৃহিণীর উপর৷ তাই পরিষ্কার, নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী রান্নার জ্বালানি নিশ্চিত করা শুধু একটি উন্নয়নমূলক প্রকল্প নয় – এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও জনস্বাস্থ্যের একটি মৌলিক প্রশ্ন৷ যতদিন না দেশের প্রতিটি পরিবার সহজে গ্যাস ব্যবহার করতে পারে, ততদিন পর্যন্ত ‘উজ্জ্বলা যোজনা’-র প্রকৃত লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলা কঠিন৷

Exit mobile version