Site icon Sangbad Hate Bazare

নাম উঠল কার, বাদ গেল কারা? ২৯ লক্ষ নিষ্পত্তি, তবুও অজানা সংখ্যা! ডাউনলোডই হচ্ছে না তালিকা! প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে বিপাকে ভোটাররা

নাম উঠল কজনের, বাদ গেল কারা—গভীর রাতের অন্ধকারে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত অতিরিক্ত ভোটার তালিকা ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম ধোঁয়াশা, আর সেই সঙ্গে বেড়েছে সাধারণ ভোটারদের উৎকণ্ঠা। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের প্রায় ২২ দিন পর হঠাৎ করে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করতে গিয়ে যে বিশৃঙ্খলা ও অস্বচ্ছতা সামনে এল, তা কার্যত কমিশনের প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের অভাবকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রথম দফার অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করতে মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হওয়া, কতজনের নাম যুক্ত হল বা কতজন বাদ পড়ল সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনও পরিসংখ্যান না দেওয়া—সব মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটিই যেন রহস্যে মোড়া। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, প্রায় ২৯ লক্ষ আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে, কিন্তু তার মধ্যে অর্ধেকের কাছাকাছি ক্ষেত্রে ‘ই-সাইন’ না থাকায় চূড়ান্ত হিসাব স্পষ্ট নয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই তালিকা কতটা নির্ভুল এবং স্বচ্ছ?

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে। বহু ভোটার অভিযোগ করছেন, বুথভিত্তিক অতিরিক্ত তালিকা ডাউনলোড করতে গিয়ে বারবার সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। সব বুথের তালিকা একসঙ্গে অ্যাক্সেস করা যাচ্ছে না, কোথাও সার্ভার ডাউন, কোথাও বা ফাইল খুলছে না—ফলে নিজের নাম আছে কি না, তা যাচাই করাই হয়ে উঠছে কঠিন। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে এমন প্রযুক্তিগত ভোগান্তি যে ভোটারদের আস্থায় বড় ধাক্কা দিচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য। এর ফলে গ্রাম থেকে শহর—সব স্তরের মানুষই বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ।

সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হল, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (CEO) দপ্তরকে নাকি অন্ধকারে রেখেই জাতীয় নির্বাচন কমিশন এই অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। রাজ্যের একাধিক আধিকারিক প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়ায় রাজ্য প্রশাসনকে কেন সম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া হল না? তালিকা প্রকাশের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত কোনও তথ্য হাতে না থাকা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার বড় ঘাটতির দিকেই ইঙ্গিত করছে। এতে কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় নিয়েও নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে।

অন্যদিকে, কমিশনের দাবি—বুথভিত্তিক তালিকা দ্রুতই সংশ্লিষ্ট জেলাশাসক দপ্তর, বিডিও ও এসডিও অফিসে টাঙিয়ে দেওয়া হবে, পাশাপাশি বুথ লেভেল অফিসার (BLO)-দের কাছেও তালিকা পৌঁছে যাবে। অর্থাৎ, অনলাইনে সমস্যা হলেও অফলাইন মাধ্যমে ভোটাররা নিজেদের নাম যাচাই করতে পারবেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—ডিজিটাল পরিষেবা যখন মূল ভরসা, তখন কেন এমন ত্রুটি? কেন আগেভাগে সিস্টেম টেস্টিং বা ব্যাকআপ পরিকল্পনা নেওয়া হল না?

এই পরিস্থিতিতে ভোটারদের মধ্যে যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা ক্রমেই বাড়ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, তাঁদের নাম যদি তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়, তবে ভোটাধিকার প্রয়োগে সমস্যা হতে পারে। যদিও কমিশন জানিয়েছে, যাঁদের নাম বাদ পড়বে তাঁরা ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হতে পারবেন। ইতিমধ্যেই ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করতে মুখ্যসচিবকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত ও কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—পরবর্তী অতিরিক্ত তালিকা আগামী শুক্রবার প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, পুরো প্রক্রিয়াটি এখনও চলমান এবং একাধিক ধাপে সম্পন্ন হবে। ফলে চূড়ান্ত ছবি পেতে এখনও সময় লাগবে। তবে ততদিন পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ বাড়াবে, তা বলাই যায়।

অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। ভোটার তালিকা হল গণতন্ত্রের ভিত্তি—সেখানে যদি এমন ধোঁয়াশা ও বিশৃঙ্খলা দেখা যায়, তবে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের আস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এখন দেখার বিষয়, কমিশন কত দ্রুত এই জট কাটিয়ে স্পষ্ট ও নির্ভুল তথ্য সামনে আনতে পারে এবং ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয় কি না।

Exit mobile version