ক্রীড়াক্ষেত্রে যৌন হেনস্তার বাড়বাড়ন্ত নিয়ে এবার সরব জাতীয় রাজনীতি—সংসদের মেঝেতে বাংলার সাংসদ দেবের তোলা প্রশ্ন ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক, আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রকের তথাকথিত ‘দায়সারা’ জবাব; বিষয়টি শুধু একটি রাজনৈতিক প্রশ্নোত্তর পর্ব নয়, বরং দেশের ক্রীড়াব্যবস্থার অন্দরমহলে লুকিয়ে থাকা এক গভীর সমস্যার প্রতিফলন। দেব স্পষ্টভাবে জানতে চেয়েছিলেন গত দশ বছরে কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রক, স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (SAI), বিভিন্ন জাতীয় ক্রীড়া সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিতে ঠিক কতগুলি যৌন হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে, সেই অভিযোগগুলির তদন্ত কীভাবে হয়েছে, দোষীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রুখতে সরকার কী কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে—অর্থাৎ এক কথায়, ক্রীড়াক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও জবাবদিহির পূর্ণ চিত্র। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল প্রশ্নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রকের তরফে যে উত্তর দেওয়া হয়েছে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ক্রীড়াক্ষেত্রে যৌন হেনস্তার বাড়বাড়ন্ত নিয়ে সংসদে তোলা প্রশ্ন ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় বিতর্ক, আর সেই প্রেক্ষাপটে বিষয়টি এবার স্পষ্টভাবে পয়েন্ট টু পয়েন্টভাবে তুলে ধরা জরুরি—
১) ইস্যুর মূল প্রেক্ষাপট :
বাংলার সাংসদ দেব সংসদে ক্রীড়াক্ষেত্রে যৌন হেনস্তা নিয়ে সরব হন। তিনি দেশের ক্রীড়া ব্যবস্থার ভেতরে থাকা নিরাপত্তাহীনতা, অভিযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার ঘাটতি তুলে ধরতে চান।
২) দেবের প্রধান উদ্দেশ্য :
শুধু অভিযোগ তোলা নয়, বরং গত এক দশকের প্রকৃত চিত্র সামনে আনা—কত অভিযোগ হয়েছে, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে এই সমস্যা রোখা যাবে, তা জানতেই তিনি প্রশ্ন করেন।
৩) মোট পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন :
দেব কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডব্যর কাছে পাঁচটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন তোলেন, যা গোটা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা যাচাই করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪) প্রথম প্রশ্ন—অভিযোগের পরিসংখ্যান :
গত ১০ বছর এবং চলতি বছরে কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রক, SAI, জাতীয় ক্রীড়া সংস্থা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যৌন হেনস্তার কত অভিযোগ উঠেছে—বছর, রাজ্য এবং খেলা অনুযায়ী বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়।
৫) দ্বিতীয় প্রশ্ন—তদন্ত ও শাস্তি :
ICC বা অন্যান্য তদন্তকারী কমিটি কীভাবে কাজ করেছে, কতগুলি মামলায় তদন্ত শেষ হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এই তথ্য জানতে চান দেব।
৬) তৃতীয় প্রশ্ন—আপিলের অবস্থা :
অভিযোগকারী বা অভিযুক্ত পক্ষ কতগুলি আপিল করেছে এবং সেই আপিলগুলির বর্তমান অবস্থা কী—এই বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য চাওয়া হয়।
৭) চতুর্থ প্রশ্ন—সরকারি পদক্ষেপ :
এই ধরনের ঘটনা রুখতে কেন্দ্রীয় সরকার কী কী নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জানার চেষ্টা করেন তিনি।
৮) পঞ্চম প্রশ্ন—মনিটরিং ও ট্র্যাকিং সিস্টেম :
দেশজুড়ে এই ধরনের মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য কোনও কেন্দ্রীয় ট্র্যাকিং ব্যবস্থা আছে কি না—না থাকলে কেন নেই, সেটাও জানতে চান দেব।
৯) কেন্দ্রের জবাব—এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ :
এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির সরাসরি উত্তর না দিয়ে কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রক অনেক ক্ষেত্রেই দায় এড়িয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
১০) ‘দায়সারা’ ব্যাখ্যা :
মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়, বিভিন্ন জাতীয় ক্রীড়া সংস্থা নিজেদের নিয়ম মেনে চলে এবং এই ধরনের সমস্যা সামলানোর জন্য তাদের নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে।
১১) পুরনো নির্দেশের উল্লেখ :
কেন্দ্র জানায়, ২০১০ সালেই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সব সংস্থাকে এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছিল—কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।
১২) সীমিত পরিসংখ্যান প্রকাশ :
মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে SAI-এর অধীনে কোচদের বিরুদ্ধে ২৫টি এবং প্রশাসনিক কর্মীদের বিরুদ্ধে ৮টি যৌন হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে।
১৩) বাস্তবতা বনাম পরিসংখ্যান :
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংখ্যা বাস্তবের তুলনায় অনেক কম হতে পারে, কারণ অধিকাংশ ভুক্তভোগী ভয় বা ক্যারিয়ারের আশঙ্কায় অভিযোগ জানান না।
১৪) সিস্টেমের বড় দুর্বলতা :
অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পরিবেশ, দ্রুত বিচার এবং স্বচ্ছ তদন্তের অভাবই এই সমস্যার মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে।
১৫) দেবের প্রশ্নের গুরুত্ব :
দেবের এই প্রশ্ন আসলে ক্রীড়াক্ষেত্রে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
১৬) বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া :
বিরোধী শিবিরের দাবি, এই ইস্যুতে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সংস্থা গঠন করা জরুরি।
১৭) বিশেষজ্ঞদের মতামত :
শুধু নিয়ম বানালেই হবে না—প্রয়োজন কঠোর বাস্তবায়ন, নিয়মিত নজরদারি, এবং বাধ্যতামূলক সচেতনতা প্রশিক্ষণ।
১৮) ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা :
অভিযোগ জানানোর জন্য নিরাপদ প্ল্যাটফর্ম, গোপনীয়তা রক্ষা এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯) ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ :
যদি এখনই শক্ত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ দুটোই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ক্রীড়াক্ষেত্রে যৌন হেনস্তার বাড়বাড়ন্ত শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং একটি কাঠামোগত ত্রুটি, যার সমাধানে প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানোর স্পষ্ট রাজনৈতিক সদিচ্ছা; আর সেই দাবিকেই সংসদের মঞ্চে তুলে ধরে দেব কার্যত একটি বড় বিতর্কের সূচনা করেছেন, যা আগামী দিনে ক্রীড়ানীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে।

