Thu. Mar 26th, 2026

রামনবমীর মিছিলে কমিশনের নজিরবিহীন নিরাপত্তা, ড্রোনে নজরদারি! বাংলাজুড়ে পথে নামল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী

রামনবমীকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এবার নজিরবিহীন সতর্কতা—নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে ধর্মীয় শোভাযাত্রা ঘিরে যাতে কোনওরকম অশান্তি না ছড়ায়, সেই লক্ষ্যেই একাধিক স্তরে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য প্রশাসন। নবান্নে মুখ্যসচিব দুষ্যন্ত নারিয়ালার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে রাজ্যের প্রতিটি জেলার ডিএম, এসপি এবং পুলিশ কমিশনারদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কোনওরকম গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) সহ একাধিক শীর্ষ আধিকারিক, যা থেকে বোঝাই যাচ্ছে প্রশাসনের প্রস্তুতি কতটা সুসংগঠিত ও কঠোর। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে হওয়া এই বৈঠকে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে নজরদারি বাড়ানো, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ জোরদার করা এবং যেকোনও প্ররোচনামূলক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই তা নিয়ন্ত্রণে আনার উপর।

ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশন ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করেছে, ফলে রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। তার মধ্যেই রামনবমীর মতো বড় ধর্মীয় উৎসব হওয়ায় প্রশাসনের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। সকাল থেকেই হাওড়া, কলকাতা, আসানসোল, মালদহ সহ বিভিন্ন জেলায় শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে, আর এই মিছিলগুলিকে কেন্দ্র করে যাতে কোনও অশান্তি বা সংঘর্ষ না হয়, সেজন্য গোটা রাজ্যজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী। শুধু রাজ্য পুলিশই নয়, একাধিক জায়গায় কেন্দ্রীয় বাহিনীও নামানো হয়েছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে। সূত্র অনুযায়ী, আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট এলাকায় এক কোম্পানি, মালদহে এক কোম্পানি, হাওড়া পুলিশ কমিশনারেট এলাকায় এক কোম্পানি এবং চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেট এলাকায় দুই কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এই বাহিনীগুলি শুধু স্থির অবস্থানে নয়, রাজ্য পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে টহলদারির কাজও চালাচ্ছে, যাতে কোনও সন্দেহজনক গতিবিধি চোখ এড়িয়ে না যায়।

কলকাতাতেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। লালবাজার সূত্রে জানা গেছে, রামনবমী উপলক্ষে শহরে প্রায় ৬০টি মিছিল বের হবে, যার মধ্যে অন্তত পাঁচটি বড় মিছিল এন্টালি, পিকনিক গার্ডেন, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, হেস্টিংস এবং কাশীপুর থেকে শুরু হবে। এই প্রতিটি মিছিলে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, এবং শুধুমাত্র সংখ্যায় নয়, প্রস্তুতিতেও কোনও খামতি রাখা হয়নি। মিছিলে থাকা পুলিশ আধিকারিক ও কর্মীদের শরীরে থাকবে বিশেষ ‘প্রোটেকটিভ গিয়ার’, যাতে হঠাৎ করে ইট-পাটকেল বা বোতল ছোড়ার মতো ঘটনা ঘটলেও তারা দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন। প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—কোনওরকম হিংসাত্মক আচরণ দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে হবে।

এছাড়াও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে। মিছিলগুলির উপর ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথে নজরদারি চালানো হবে, যা ভিড়ের গতিবিধি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে। প্রতিটি বড় মিছিলের রুটে বসানো হয়েছে অতিরিক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা, এবং সেগুলির লাইভ ফিড মনিটরিং করা হচ্ছে কন্ট্রোল রুম থেকে। শুধু তাই নয়, বহু পুলিশকর্মীর শরীরে লাগানো হয়েছে বডি ক্যামেরা, যাতে মাঠপর্যায়ের প্রতিটি ঘটনা রেকর্ডে থাকে এবং পরবর্তীকালে কোনও অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করা সহজ হয়। মিছিলের আগে ও পরে পুলিশি টহল, রাস্তায় পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ গাড়ির উপস্থিতি—সব মিলিয়ে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।

রামনবমী উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গে এবারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা একেবারে নজিরবিহীন। নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মীয় আবেগ যাতে কোনওভাবেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটায়, সেদিকেই নজর দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন। কড়া নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য বাহিনীর যৌথ মোতায়েন—সবকিছু মিলিয়ে স্পষ্ট বার্তা, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাই এবার প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।

Related Post

Leave a Reply