খাদ্যরসিকদের জন্য আবারও এক ধাক্কা! জনপ্রিয় ফুড ডেলিভারি অ্যাপ Zomato-তে খাবার অর্ডার করা এখন আগের তুলনায় আরও খরচসাপেক্ষ হতে চলেছে। দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত চার্জ নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষ জমে উঠছিল, আর সেই আবহেই এল নতুন মূল্যবৃদ্ধির খবর। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি অর্ডারের ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্ম ফি বাড়ানো হয়েছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে মোট বিলের পরিমাণ। আগে যেখানে প্ল্যাটফর্ম ফি ছিল ১২ টাকা ৫০ পয়সা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ টাকা ৯০ পয়সায়—অর্থাৎ অর্ডার পিছু প্রায় ২ টাকা ৪০ পয়সা বেশি খরচ করতে হবে গ্রাহকদের। শুনতে অল্প মনে হলেও, নিয়মিত যারা অনলাইনে খাবার অর্ডার করেন, তাঁদের মাসিক খরচে এই বাড়তি চাপ যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পারে। একইসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাপ Swiggy-এর প্ল্যাটফর্ম ফিও প্রায় একই স্তরে পৌঁছে গিয়েছে, যা বাজারে প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলছে।
এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা নিচ্ছে। বিশেষ করে Iran conflict ঘিরে তৈরি হওয়া অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে সরাসরি অর্থনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার উপর। এলপিজি সরবরাহে বিঘ্ন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে ফুড ডেলিভারি সংস্থাগুলির অপারেশনাল খরচ বেড়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এর জেরেই সংস্থাগুলি নিজেদের ব্যয় সামলাতে গ্রাহকদের উপর অতিরিক্ত ফি চাপাতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চাপ, অন্যদিকে গ্রাহক ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে সংস্থাগুলিকে।
২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করা Zomato আজ দেশের ছোট-বড় প্রায় সব শহরেই তাদের পরিষেবা বিস্তার করেছে। মোবাইলের এক ক্লিকেই পছন্দের খাবার বাড়ির দরজায় পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা মানুষের জীবনযাত্রাকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। ব্যস্ত জীবনে সময় বাঁচাতে এবং বৈচিত্র্যময় খাবারের স্বাদ পেতে এই ধরনের অ্যাপের উপর নির্ভরতা ক্রমশ বেড়েছে। কিন্তু পরিষেবার সঙ্গে সঙ্গে যদি খরচও বাড়তে থাকে, তাহলে গ্রাহকদের ধৈর্যের সীমা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
এদিকে বাজারে নতুন প্রতিযোগী হিসেবেও উঠে এসেছে Rapido, যারা সম্প্রতি ফুড ডেলিভারি পরিষেবা শুরু করেছে। সবচেয়ে বড় চমক হল—তারা এখনও পর্যন্ত কোনও অতিরিক্ত প্ল্যাটফর্ম ফি নিচ্ছে না। এই কৌশল নিঃসন্দেহে গ্রাহকদের আকর্ষণ করার একটি বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চাপ বাড়ছে Zomato এবং Swiggy-র মতো প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলির উপর। কারণ, যেখানে একদিকে গ্রাহকরা কম খরচে পরিষেবা পাচ্ছেন, সেখানে অন্যদিকে বাড়তি চার্জ তাঁদের বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করছে।
শুধু গ্রাহকরাই নন, এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে ডেলিভারি কর্মীদের উপরও। বিভিন্ন সংস্থার গিগ ওয়ার্কারদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে অর্ডারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মানুষের খরচের ধরনে পরিবর্তন এসেছে—অনেকেই এখন অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দিচ্ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ফুড ডেলিভারি ইন্ডাস্ট্রিতে। অর্ডার কমে যাওয়ায় ডেলিভারি পার্টনারদের আয়ের উপরও চাপ তৈরি হচ্ছে, যা তাঁদের জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
একদিকে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং বাড়তি অপারেশনাল খরচ—এই তিনের চাপে ফুড ডেলিভারি সেক্টর এখন এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ গ্রাহকের পকেটে। এখন দেখার বিষয়, ভবিষ্যতে সংস্থাগুলি কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেয়—তারা কি আবার কোনও নতুন অফার বা ডিসকাউন্ট নিয়ে আসবে, নাকি এই বাড়তি খরচই নতুন স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। তবে আপাতত এটুকু স্পষ্ট, অনলাইনে খাবার অর্ডার করার আগে এবার গ্রাহকদের দু’বার ভাবতেই হবে!

