ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং ভুয়ো প্রচারমুক্ত করতে বড় পদক্ষেপ নিল নির্বাচন কমিশন। আসন্ন নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের জন্য একগুচ্ছ নতুন নিয়ম জারি করে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—এবার আর শুধু মাঠে-ময়দানে প্রচার নয়, ডিজিটাল জগতেও কড়া নজরদারি চলবে। বিশেষ করে সমাজমাধ্যমে ভুয়ো খবর, বিভ্রান্তিকর প্রচার এবং অপ্রমাণিত তথ্য ছড়ানো রুখতেই এই কঠোর নির্দেশিকা কার্যকর করা হচ্ছে। ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হল—প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়ই নিজেদের সমস্ত সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য জানাতে হবে। শুধু নামমাত্র তথ্য নয়, বরং কোন কোন প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট রয়েছে, কতগুলি ভেরিফায়েড বা স্বীকৃত অ্যাকাউন্ট আছে, এবং সেগুলির প্রকৃতি কী—সব কিছুই হলফনামার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। অর্থাৎ Facebook, X (Twitter), Instagram, YouTube বা অন্য কোনও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি থাকলে তার পূর্ণ বিবরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই নিয়মের মূল উদ্দেশ্য হল—ভুয়ো বা বেনামি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার বা অপপ্রচার রোধ করা।
কমিশনের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন ঘিরে সমাজমাধ্যমে ভুয়ো খবর ছড়ানো এক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ভুয়ো প্রোফাইল বা অজ্ঞাত পরিচয়ের অ্যাকাউন্ট থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে ভোটারদের মনোভাব প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। এই পরিস্থিতিতে প্রার্থীদের ডিজিটাল পরিচয় স্বচ্ছ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই এই নতুন নিয়ম কার্যকর হলে, কে কোন তথ্য কোথা থেকে ছড়াচ্ছেন তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এর পাশাপাশি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে কঠোর নিয়ন্ত্রণ। কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনও রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা সংগঠন সরাসরি সমাজমাধ্যম বা ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপন দিতে পারবে না, যদি না আগে Media Certification and Monitoring Committee বা এমসিএমসি-র অনুমোদন নেওয়া হয়। এই কমিটি প্রতিটি বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেবে সেটি প্রচারের যোগ্য কি না। ফলে বিভ্রান্তিকর, উত্তেজনাপূর্ণ বা ভুয়ো তথ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন সহজেই আটকানো যাবে।
জেলা স্তরে এমসিএমসি-র কাছে বিজ্ঞাপন অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে পারবেন প্রার্থীরা। স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলিকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তাদের সদর দফতর থেকে আবেদন জানাতে হবে। যদি কোনও প্রার্থী বা দল এমসিএমসি-র সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হন, তবে তাদের জন্যও রাখা হয়েছে আপিলের সুযোগ। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের নেতৃত্বে একটি বিশেষ আপিল কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যাবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—অনুমোদন ছাড়া কোনও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রকাশ করলে তা সরাসরি নিয়মভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুধু বিজ্ঞাপন নয়, ‘পেইড নিউজ’ বা টাকার বিনিময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রচার নিয়েও কড়া অবস্থান নিয়েছে কমিশন। এমসিএমসি নজর রাখবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিটি রাজনৈতিক কনটেন্টের উপর। কোনও খবর যদি অর্থের বিনিময়ে প্রকাশিত হয় এবং তা যথাযথভাবে চিহ্নিত না করা হয়, তবে সেটিও নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হবে। এর ফলে ভোটাররা নিরপেক্ষ এবং সঠিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
এছাড়াও প্রার্থীদের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—ভোট প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার ৭৫ দিনের মধ্যে তাদের সমস্ত প্রচার খরচের হিসাব জমা দিতে হবে। এই হিসাবের মধ্যে সমাজমাধ্যমে করা খরচও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অর্থাৎ ডিজিটাল ক্যাম্পেইনে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কোন প্ল্যাটফর্মে কত খরচ হয়েছে—সবকিছুই স্বচ্ছভাবে জানাতে হবে। এতে করে নির্বাচনী ব্যয়ের উপর আরও কড়া নজরদারি সম্ভব হবে।
এই সমস্ত নতুন নিয়ম কার্যকর করার আগে নির্বাচন কমিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকও করেছে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক, পুলিশ নোডাল অফিসার এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক আধিকারিকরা। পাশাপাশি সমাজমাধ্যম সংস্থাগুলির প্রতিনিধিরাও এই বৈঠকে অংশ নেন। মূল আলোচ্য বিষয় ছিল—কীভাবে ভুয়ো খবর এবং বিভ্রান্তিকর প্রচার রোখা যায় এবং নির্বাচনকে আরও সুষ্ঠু করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপগুলি ডিজিটাল যুগের নির্বাচনী ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে চলেছে। কারণ এখন ভোটের লড়াই শুধু রাস্তায় বা সভামঞ্চে সীমাবদ্ধ নেই—তা ছড়িয়ে পড়েছে মোবাইল স্ক্রিন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিটি কোণায়। ফলে এই ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণে আনা অত্যন্ত জরুরি ছিল।
এদিকে আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ অনুষ্ঠিত হবে ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল—দু’দফায়। মোট ২৯৪টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে এবং ফল ঘোষণা করা হবে ৪ মে। দীর্ঘদিন পর এত কম দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, যা প্রশাসনিকভাবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে কমিশন ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, দফা কম হলেও নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে কোনও রকম আপস করা হবে না।
সমাজমাধ্যমের যুগে নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখতে এই নতুন নিয়মগুলি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রার্থীদের ডিজিটাল পরিচয়ের স্বচ্ছতা, বিজ্ঞাপনের উপর কড়া নিয়ন্ত্রণ, পেইড নিউজ রোধ এবং ব্যয়ের হিসাবের কঠোর নিয়ম—সব মিলিয়ে নির্বাচনী ব্যবস্থায় এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে কমিশন। এর ফলে সাধারণ ভোটাররা আরও সচেতন হবেন এবং ভুয়ো প্রচারের ফাঁদে পা দেওয়ার সম্ভাবনাও অনেকটাই কমবে।

