Site icon Sangbad Hate Bazare

নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা সঙ্কট! ৩ মে কি হবে কলকাতা ডার্বি? জোর জল্পনা ফুটবলমহলে

পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ যেমন বাড়ছে, তেমনই তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ক্রীড়াঙ্গনেও৷ বিশেষ করে ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত লড়াই – ‘কলকাতা ডার্বি’ – নিয়ে তৈরি হয়েছে বড়সড় অনিশ্চয়তা৷ নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার চাপে আইএসএলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ম্যাচের সূচি বদলাতে পারে বলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে৷ এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ‘ইস্টবেঙ্গল এফসি’ এবং ‘মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট’-এর বহুল প্রতীক্ষিত ডার্বি ম্যাচ৷

সম্প্রতি ঘোষণা হয়েছে ‘পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬’-এর নির্ঘণ্ট৷ নির্বাচন কমিশনের সূচি অনুযায়ী রাজ্যে এবারের ভোটগ্রহণ হবে দুই দফায় – ২৩ এপ্রিল এবং ২৯ এপ্রিল৷ আর ভোটের ফল প্রকাশ করা হবে ৪ মে৷ ঠিক এই ফল ঘোষণার আগের দিন অর্থাৎ ৩ মে নির্ধারিত রয়েছে আইএসএলের কলকাতা ডার্বি৷ ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে – নির্বাচনের এত বড় নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচ আয়োজন করা আদৌ সম্ভব হবে কি না৷

## নির্বাচন ও ফুটবল সূচির সংঘাত

ফুটবলপ্রেমীদের কাছে কলকাতা ডার্বি শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং আবেগ, ইতিহাস এবং শহরের ঐতিহ্যের প্রতীক৷ প্রতি বছর এই ম্যাচকে ঘিরে হাজার হাজার সমর্থকের ভিড় জমে স্টেডিয়ামে এবং টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখেন লক্ষাধিক দর্শক৷ কিন্ত্ত এবার নির্বাচনী আবহে পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন হতে পারে৷

নির্বাচনের ফল ঘোষণার মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে এত বড় ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা৷ সাধারণত ডার্বি ম্যাচে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়৷ কিন্ত্ত ভোটের ফল ঘোষণার আগে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের অধিকাংশ পুলিশ বাহিনী নির্বাচনী দায়িত্বে ব্যস্ত থাকবে৷ ফলে স্টেডিয়ামে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে৷

## কী কী বিকল্প ভাবছে আয়োজকরা

বর্তমানে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দুটি সম্ভাব্য পথ খোলা রয়েছে৷ প্রথমত, কলকাতার বাইরে অন্য কোনো রাজ্যে ম্যাচটি সরিয়ে নেওয়া হতে পারে৷ দ্বিতীয়ত, ম্যাচের দিন পরিবর্তন করে নির্বাচন-পরবর্তী সময়সূচিতে স্থানান্তর করা হতে পারে৷ তবে এই দুই সিদ্ধান্তের কোনটি কার্যকর হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি৷

আইএসএল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, এবারের সূচি তৈরির দায়িত্ব ছিল মূলত ক্লাবগুলির প্রতিনিধিদের ওপর৷ এই বিষয়ে কল্যাণ চৌবে, যিনি ‘অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন’-এর সভাপতি, জানিয়েছেন যে ফেডারেশন সরাসরি সূচি তৈরি করেনি৷ তাঁর কথায়, ক্লাবগুলিই আলোচনা করে এই সূচি ঠিক করেছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তারাই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে৷

তিনি আরও জানান, নির্বাচনজনিত পরিস্থিতি বিবেচনা করে ক্লাবগুলি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নতুন প্রস্তাব ফেডারেশনের কাছে পাঠাতে পারে৷ সেই প্রস্তাব অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে৷

## শুধু ডার্বি নয়, অনিশ্চয়তায় একাধিক ম্যাচ

শুধু কলকাতা ডার্বিই নয়, নির্বাচনের সময়সূচির সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি হয়েছে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের ক্ষেত্রেও৷

২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটের ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ ২৪ এপ্রিল নির্ধারিত রয়েছে ‘ইস্টবেঙ্গল এফসি’ বনাম ‘পাঞ্জাব এফসি’ ম্যাচ৷ ভোটের পরপরই এই ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে৷

এরপর ২৬ এপ্রিল কলকাতায় রয়েছে ‘মেোহনবাগান সুপার জায়ান্ট’ বনাম ‘ইন্টার কাশী’-এর ম্যাচ৷ দুই দলের সমর্থকদের উপস্থিতিতে এই ম্যাচেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ ফলে প্রশাসনের পক্ষে একই সঙ্গে ভোট এবং ম্যাচের নিরাপত্তা সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে৷

এছাড়া ২৮ এপ্রিল নির্ধারিত রয়েছে ‘ইস্টবেঙ্গল এফসি’ বনাম ‘ওডি়শা এফসি’ ম্যাচ, যা হওয়ার কথা ‘যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন’-এ৷ কিন্ত্ত তার ঠিক পরের দিনই দ্বিতীয় দফার ভোট৷ ফলে নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তা মোতায়েনের কারণে এই ম্যাচের দিনও পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না৷

## ৩ মে একদিনে দুই বড় ম্যাচ

সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে ৩ মে-কে ঘিরে৷ সেদিনই একদিকে রয়েছে ঐতিহাসিক কলকাতা ডার্বি, অন্যদিকে ‘মহামেডান স্পোর্টিং’ বনাম ‘মুম্বই সিটি এফসি’ ম্যাচ৷ দ্বিতীয় ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ‘কিশোর ভারতী ক্রীড়াঙ্গন’-এ৷

একই দিনে শহরের দুই স্টেডিয়ামে দুটি বড় ম্যাচ আয়োজন করতে গেলে বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী প্রয়োজন৷ কিন্ত্ত নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগের দিন রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে প্রশাসনের প্রধান নজর থাকবে ভোটকেন্দ্র ও গণনা কেন্দ্রগুলির দিকে৷ ফলে ফুটবল ম্যাচের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাহিনী পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে৷

## সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ

এই অনিশ্চয়তার কারণে সমর্থকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে৷ বিশেষ করে কলকাতা ডার্বি নিয়ে উন্মাদনা প্রতি বছরই তুঙ্গে থাকে৷ অনেক সমর্থক আগাম পরিকল্পনা করে ম্যাচ দেখতে আসেন৷ যদি ম্যাচের দিন পরিবর্তন হয় বা অন্য রাজ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে তাদের পরিকল্পনাতেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে৷

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়৷ তাই প্রয়োজনে ফুটবল ম্যাচের সূচি বদলানোই হতে পারে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত৷

## চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

এখনও পর্যন্ত ‘অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন’ বা আইএসএল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা করা হয়নি৷ ক্লাব প্রতিনিধিদের আলোচনার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানা গেছে৷

উল্লেখ্য, শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় – একই দিনে দেশের আরও কয়েকটি রাজ্যে ভোটের ফল ঘোষণা হবে৷ এর মধ্যে রয়েছে অসম, তামিলনাড়ু, কেরল এবং পুদুচেরি৷ ফলে জাতীয় স্তরেও প্রশাসনের নজর থাকবে নির্বাচনী ফল ঘোষণার দিকে৷

সব মিলিয়ে বলা যায়, রাজনীতির উত্তাপে আপাতত অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনিয়েছে ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই কলকাতা ডার্বিকে ঘিরে৷ ম্যাচটি পিছোবে, অন্য রাজ্যে যাবে নাকি নির্ধারিত দিনেই অনুষ্ঠিত হবে – এই প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ের অপেক্ষা৷ তবে একটাই নিশ্চিত, যেখানেই হোক না কেন, ইস্ট-মোহনের ডার্বি মানেই আবেগ, উত্তেজনা আর ফুটবলপ্রেমীদের অগাধ ভালোবাসা৷

Exit mobile version