Tue. Mar 24th, 2026

হাওড়া জেলার রাজনৈতিক মানচিত্রে ১৭৫ নম্বর পাঁচলা বিধানসভা কেন্দ্র এক সময় ছিল ফরওয়ার্ড ব্লকের দুর্ভেদ্য দুর্গ, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বাম রাজনীতির শক্ত ভিত গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে, আর বর্তমানে এই কেন্দ্র তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাববলয়ে পরিণত হয়েছে—যা রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রার্থী ডলি রায়ের জয়ের পর থেকে এই আসনে বামেদের প্রভাব ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকে, আর ২০২১ সালের নির্বাচনে জোট রাজনীতির কারণে ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী না দেওয়ায় সেই শূন্যতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তবে আসন্ন নির্বাচনে সেই হারানো জমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ফরওয়ার্ড ব্লক নতুন করে ঘুঁটি সাজিয়েছে এবং প্রার্থী হিসেবে সামনে এনেছে দীর্ঘদিনের সংগঠক ফরিদ মোল্লাকে। রবিবার সন্ধ্যায় রানীহাটির ‘অশোক ঘোষ’ ভবনে কর্মীসভা শেষে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, এবারের নির্বাচন শুধুমাত্র ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, বরং রাজ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

তার বক্তব্যে উঠে আসে গত ১৫ বছরের শাসনকালের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও অভিযোগ। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ তৃণমূল শাসনে রাজ্যজুড়ে উন্নয়নের পরিবর্তে দুর্নীতি, কাটমানি এবং তোলাবাজির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। একাধিক তৃণমূল নেতা-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং কারাবাসের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ পরিবর্তন চাইছে। তার মতে, শুধুমাত্র ভাতা, মেলা বা বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প দিয়ে স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়—প্রয়োজন শিল্প, কর্মসংস্থান এবং স্বচ্ছ প্রশাসন।

পাঁচলা বিধানসভা কেন্দ্রের প্রসঙ্গ টেনে ফরিদ মোল্লা জানান, এই অঞ্চলে শিল্পোন্নয়নের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে কোনো বড় শিল্প গড়ে ওঠেনি। একসময় পাঁচলার প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষ জরি ও দর্জি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সেই ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। জরি হাব তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে সেই জমি এখন পরিত্যক্ত বা অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। একইভাবে ফাউন্ড্রি পার্কের প্রকল্পও কার্যত থমকে রয়েছে। বরং জাতীয় সড়ক সংলগ্ন এলাকায় বহুজাতিক সংস্থার উদ্যোগে তৈরি হয়েছে লজিস্টিক পার্ক, যেখানে উৎপাদনের বদলে শুধুমাত্র পণ্য সংরক্ষণ করা হয়। এর ফলে স্থানীয় মানুষের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি, বরং কম মজুরিতে বেশি পরিশ্রম করিয়ে শ্রমিক শোষণের অভিযোগ উঠছে।

কৃষিক্ষেত্রেও পাঁচলার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে তিনি দাবি করেন। চাষযোগ্য জমি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কারণ একদল অসাধু জমি মাফিয়া সেই জমিতে ফ্লাই অ্যাশ ফেলে ভরাট করে শিল্পের নামে বিক্রি করছে। এতে কৃষকরা জমি হারাচ্ছেন এবং চাষের সুযোগ কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি, সঠিক সহায়ক মূল্য না পাওয়ায় কৃষকদের আর্থিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বহু মানুষ কাজের খোঁজে রাজ্যের বাইরে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা পাঁচলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও তিনি একাধিক অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, রাজ্যজুড়ে প্রায় ৮,৫০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে এবং বহু সরকারি স্কুলে শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার মান ভেঙে পড়ছে। ফলে স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় সংকেত। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পের নামে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এখনও পর্যাপ্ত চিকিৎসা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত। তাছাড়া, তফসিলি জাতি, উপজাতি এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গ দেশের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে বলে তিনি দাবি করেন।

ঐতিহাসিক দিক থেকে পাঁচলা বিধানসভা কেন্দ্র ফরওয়ার্ড ব্লকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫২ সালের সাধারণ নির্বাচন থেকে শুরু করে কানাই লাল ভট্টাচার্য, অপূর্ব লাল মজুমদার, পশুপতি ঘোষ, সন্তোষ দাস, শৈলেন মণ্ডল এবং ডলি রায়ের মতো নেতারা এই কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে বিধানসভায় গিয়েছেন। ফলে এই কেন্দ্রের সঙ্গে দলের আবেগ ও ঐতিহ্য গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। যদিও বর্তমান সময়ে সংগঠন কিছুটা দুর্বল হয়েছে, তবুও নতুন করে জনসংযোগ এবং কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে সেই পুরনো শক্তি ফিরে আসছে বলে দলের দাবি।

নির্বাচনী প্রচারে বাধা, দেওয়াল লিখনে সমস্যা—এসব অভিযোগও সামনে এসেছে, তবে ফরওয়ার্ড ব্লকের কর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রার্থী ফরিদ মোল্লা আশাবাদী যে, মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ জমে উঠেছে, তা ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হবে এবং পাঁচলায় আবারও বাম রাজনীতির পুনরুত্থান ঘটবে। সব মিলিয়ে, পাঁচলা বিধানসভা কেন্দ্রের আসন্ন নির্বাচন শুধুমাত্র একটি আসনের লড়াই নয়, বরং রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে চলেছে—যেখানে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের পথ।

By Sangbad Hate Bazare

“Sangbad Hate Bazare”—”News in the Marketplace”—is more than just a name. It is a commitment to bringing authentic, accessible, and people-centric journalism to the digital streets of Bengal and beyond. Inspired by the ethos of public discourse and open conversation, we present news that’s as diverse and dynamic as the society we serve. Operating under the digital identity “ehatebazare”, our platform is built for the Bengali-speaking global audience. Whether you are in Kolkata, Siliguri, Dhaka, London, or New York, if you speak Bengali, we are your home for news and insights.

Related Post

Leave a Reply