Site icon Sangbad Hate Bazare

QR কোডে রাজনীতি! ‘DD-কে বলো’ দিয়ে মানুষের দরজায় দীপ্সিতা, ভোটের নতুন বাজি সিপিএমের

রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দানে ভোটের উত্তাপ যত বাড়ছে, ততই প্রচারের কৌশলে দেখা যাচ্ছে নতুন নতুন চমক—আর সেই চমকের কেন্দ্রবিন্দুতেই এবার উঠে এসেছেন সিপিএম প্রার্থী দীপ্সিতা ধর। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচির আদলে এবার ‘DD-কে বলো’ চালু করে কার্যত প্রচারের লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করার চেষ্টা করছে বাম শিবির। প্রশ্ন উঠছে—এই কৌশল কি সত্যিই ভোটের ময়দানে হালে পানি পাবে, নাকি তা শুধুই আলোচনার ঝড় তুলেই থেমে যাবে? উত্তর দমদম কেন্দ্রকে সামনে রেখে তৈরি হওয়া এই নতুন প্রচার মডেল ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।

এই ‘DD-কে বলো’ আসলে কী? খুব সহজভাবে বললে, এটি একটি ডিজিটাল সংযোগ ব্যবস্থা, যেখানে এলাকার বাসিন্দারা একটি কিউআর কোড স্ক্যান করেই সরাসরি তাঁদের সমস্যা জানাতে পারবেন প্রার্থী দীপ্সিতা ধরকে। আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেই এই কিউআর কোড শেয়ার করে দীপ্সিতা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—তিনি সরাসরি মানুষের কথা শুনতে চান। পোস্টারে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা যেমন তির্যক, তেমনই বাস্তবের প্রতিচ্ছবি—‘বন্ধ স্কুল, খেলার মাঠে তালা, নর্দমার জল জমে উঠোন ভাসছে, মশার উপদ্রবে ম্যালেরিয়ার নৃত্য, রাস্তা যেন অফ-রোডিং ট্র্যাক’—এইসব সমস্যার কথা তুলে ধরে ভোটারদের আবেগে নাড়া দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

 

তবে এই কৌশলের পিছনে যে রাজনৈতিক হিসেব রয়েছে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচি চালু করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি জনসংযোগের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। সাধারণ মানুষ টোল-ফ্রি নম্বরে ফোন করে অভিযোগ জানাতেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত সমাধানও পেতেন। সেই মডেল এতটাই সফল হয়েছিল যে তা কার্যত তৃণমূলের ভোট কৌশলের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এবার সেই সফল মডেলকেই নিজের মতো করে ব্যবহার করতে চাইছে সিপিএম। ‘ছাব্বিশে শূন্য’ কাটানোর লক্ষ্যেই যে বাম শিবির মরিয়া, তা এই উদ্যোগ থেকেই স্পষ্ট।

তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—একই ফর্মুলা ব্যবহার করে কি একই সাফল্য পাওয়া সম্ভব? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র কনসেপ্ট কপি করলেই হবে না, তার বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হচ্ছে সেটাই আসল। মমতার ‘দিদিকে বলো’ সফল হয়েছিল কারণ সেটি ছিল একটি সংগঠিত, প্রশাসনিকভাবে সমর্থিত এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। অন্যদিকে, ‘DD-কে বলো’ আপাতত একটি নির্বাচনী প্রচার কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ফলে এর প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা সময়ই বলবে।

অন্যদিকে, এই উদ্যোগকে ঘিরে কটাক্ষ করতেও ছাড়েনি তৃণমূল। স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, এটি নিছকই ‘নকল’ এবং ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা। তাঁদের মতে, যাঁরা এতদিন ক্ষমতার বাইরে থেকেও মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেননি, তাঁরা এখন ভোটের আগে হঠাৎ করে জনসংযোগের কথা বলছেন কেন—এই প্রশ্নও তুলছেন তাঁরা। তবে বাম শিবিরের পাল্টা দাবি, মানুষের সমস্যার কথা শোনা এবং তা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়াই গণতন্ত্রের আসল চেতনা, আর সেই পথেই হাঁটছেন দীপ্সিতা।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলার রাজনীতিতে এখন ডিজিটাল প্রচারের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। কিউআর কোড, সোশ্যাল মিডিয়া, সরাসরি অনলাইন যোগাযোগ—সব মিলিয়ে ভোটের লড়াই এখন আর শুধু সভা-সমাবেশে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পৌঁছে গেছে মানুষের মোবাইল স্ক্রিনে। তরুণ ভোটারদের টার্গেট করতেই এই ধরনের উদ্যোগ বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

‘DD-কে বলো’ শুধুমাত্র একটি প্রচার স্লোগান নয়, বরং একটি রাজনৈতিক পরীক্ষা—যেখানে দেখা হবে, পুরনো আদর্শকে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মেলাতে পারলে কতটা লাভ হয়। দীপ্সিতা ধর এই উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেকে ‘অ্যাক্সেসিবল’ এবং ‘জনমুখী’ প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। তবে শেষ কথা বলবে ভোটাররাই—তাঁরা কি এই নতুন উদ্যোগে আস্থা রাখবেন, নাকি একে শুধুই নির্বাচনী স্টান্ট বলে উড়িয়ে দেবেন?

বাংলার রাজনৈতিক ময়দানে এই মুহূর্তে ‘DD-কে বলো’ এক নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—এটি কি সত্যিই সিপিএমের ভাগ্য বদলাবে, নাকি শুধুই প্রচারের ঝলকানি হয়ে থাকবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

Exit mobile version