Site icon Sangbad Hate Bazare

৪ কোটির বেশি মানুষ চাকরি খুঁজছেন! NCS পোর্টালে ভিড়! কাগজে কমছে বেকারত্ব, ৮ কোটির বেশি শূন্যপদ

দেশে কর্মসংস্থান নিয়ে কেন্দ্রের দাবি বনাম বাস্তব—এই দ্বন্দ্ব এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে। একদিকে মোদি সরকারের দাবি, দেশে ক্রমাগত চাকরির সুযোগ বাড়ছে এবং বেকারত্ব কমছে; অন্যদিকে সরকারি পোর্টালেই কাজের খোঁজে নথিভুক্তির সংখ্যা আকাশছোঁয়া—ফলে প্রশ্ন উঠছে, কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্র আসলে কী?

দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়ে আসছে, বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে নতুন নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আত্মনির্ভর ভারত, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, স্টার্টআপ ইন্ডিয়া—এই ধরনের উদ্যোগগুলিকে সামনে রেখে বারবার বলা হয়েছে, যুব সমাজের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলছে। সেই সঙ্গে পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (PLFS)-এর তথ্য তুলে ধরে দাবি করা হয়েছে, দেশে বেকারত্বের হারও ক্রমশ কমছে।

কিন্তু এই দাবির মাঝেই উঠে আসছে এক ভিন্ন ছবি, যা প্রশ্ন তুলছে সরকারি পরিসংখ্যানের বাস্তবতা নিয়ে। শ্রমমন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ‘ন্যাশনাল কেরিয়ার সার্ভিস (NCS) পোর্টালে’ কাজের খোঁজে নাম নথিভুক্ত করেছেন ৪ কোটি ৪৭ লক্ষেরও বেশি কর্মপ্রার্থী। এই সংখ্যা শুধু বড়ই নয়, বরং তা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনও সক্রিয়ভাবে কাজ খুঁজছেন।

আরও চমকপ্রদ তথ্য হল, একই সময়ে এই পোর্টালে ৮ কোটি ১০ লক্ষেরও বেশি শূন্যপদ নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে যেমন চাকরির সুযোগের সংখ্যা বাড়ছে বলে দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে কাজ খুঁজছেন এমন মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে—যা পুরো চিত্রটিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরিসংখ্যান। জানা গিয়েছে, শুধুমাত্র এক বছরেই প্রায় ৪ কোটি কর্মপ্রার্থী এই পোর্টালে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করেছেন। এই বিপুল সংখ্যক নতুন চাকরিপ্রার্থী একসঙ্গে সিস্টেমে প্রবেশ করায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—যদি বেকারত্ব কমে থাকে, তবে এত মানুষ হঠাৎ করে কাজ খুঁজতে নাম লেখাচ্ছেন কেন?

এই ইস্যু সংসদেও পৌঁছে গিয়েছে। একাধিক সাংসদ লোকসভায় লিখিত প্রশ্নের মাধ্যমে এই তথ্য জানতে চান। তার উত্তরে কেন্দ্রীয় শ্রম প্রতিমন্ত্রী শোভা করন্দলাজে জানান, গত পাঁচ বছরে NCS পোর্টালে নথিভুক্ত নিয়োগকর্তার সংখ্যা প্রায় ৫৬ লক্ষ ১৭ হাজার। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের জন্য প্ল্যাটফর্মে কোম্পানি ও সংস্থার অংশগ্রহণও বেড়েছে।

এছাড়াও ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত NCS পোর্টালে ৩ কোটি ৬৬ লক্ষেরও বেশি শূন্যপদ নথিভুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। এই তথ্য একদিকে যেমন সুযোগের সংখ্যা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়, তেমনি অন্যদিকে এই সুযোগগুলির বাস্তব রূপায়ণ কতটা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

এখানেই মূল বিতর্ক—কাগজে কলমে চাকরির সংখ্যা বাড়লেও, বাস্তবে সেই চাকরি কতটা স্থায়ী, কতটা মানসম্পন্ন এবং কতজনের কাছে পৌঁছচ্ছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, নথিভুক্ত শূন্যপদগুলির মধ্যে চুক্তিভিত্তিক বা স্বল্পমেয়াদি কাজের আধিক্য রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেয় না।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি অনুযায়ী, PLFS রিপোর্ট বলছে—২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে দেশে বেকারত্বের হার ছিল ৭ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪-এ কমে হয়েছে ৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ছবি তুলে ধরে, কিন্তু NCS পোর্টালের ক্রমবর্ধমান নথিভুক্তির সঙ্গে তা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটাই এখন বিশ্লেষণের বিষয়।

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, NCS পোর্টালে নথিভুক্তির বৃদ্ধি সবসময় নেতিবাচক নয়। এটি ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত হতে পারে, যেখানে বেশি মানুষ এখন অনলাইনে চাকরি খুঁজছেন। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য, যদি পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন চাকরি তৈরি না হয়, তাহলে এই সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তেই থাকবে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—গ্রাম ও শহরের কর্মসংস্থানের পার্থক্য। শহরাঞ্চলে কিছুটা সুযোগ তৈরি হলেও গ্রামীণ এলাকায় এখনও কাজের অভাব প্রকট। ফলে গ্রাম থেকে শহরে কাজের খোঁজে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা সামগ্রিক চাপ তৈরি করছে চাকরির বাজারে।

কর্মসংস্থান নিয়ে কেন্দ্রের দাবি এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে একটি স্পষ্ট ফাঁক ধরা পড়ছে। একদিকে সরকারি রিপোর্টে বেকারত্ব কমার ছবি, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষের কাজের খোঁজে নথিভুক্তি—এই দ্বৈত চিত্রই এখন দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং বাস্তবমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থায়ী চাকরির সুযোগ তৈরি করা। কারণ শেষ পর্যন্ত সংখ্যার খেলায় নয়, মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনই নির্ধারণ করবে দেশের কর্মসংস্থানের প্রকৃত চিত্র।

Exit mobile version