Site icon Sangbad Hate Bazare

মমতার পথে মোদি! কেরলে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ মডেলে বিজেপির বড় বাজি, মহিলাদের ৩০০০ টাকা বিজেপির

কেরলের মাটিতে প্রথমবার ক্ষমতার স্বাদ পেতে মরিয়া বিজেপি, আর সেই লক্ষ্যেই এবার চমকপ্রদ কৌশল—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ মডেলের ছায়ায় সাজানো নির্বাচনী ইস্তেহার। রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই জোর আলোচনা শুরু হয়েছে—যে ‘খয়রাতি’ রাজনীতির সমালোচনা একসময় করত বিরোধীরা, আজ সেই পথেই হাঁটছে দেশের শাসকদল। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সময় কি তবে প্রমাণ করে দিল মমতার সামাজিক সুরক্ষা মডেলের কার্যকারিতা?

কেরলে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে। আগামী ৯ এপ্রিল একদফায় ১৪০টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। এই দক্ষিণী রাজ্যে এখনও পর্যন্ত কোনওদিন সরকার গড়তে পারেনি বিজেপি। তাই এবারের লড়াই তাদের কাছে শুধু নির্বাচন নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। আর সেই কারণেই ভোটের আগে জনমনে প্রভাব ফেলতে একগুচ্ছ জনমুখী প্রকল্পের ঘোষণা করেছে গেরুয়া শিবির।

সবচেয়ে বেশি চর্চায় এসেছে মহিলাদের জন্য মাসিক ভাতা ঘোষণা। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর ধাঁচে কেরলের মহিলাদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিধবা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সি প্রবীণ নাগরিকদের জন্যও একই ভাতার ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ সরাসরি নগদ সহায়তার মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর স্পষ্ট কৌশল নিয়েছে বিজেপি।

এখানেই থেমে থাকেনি প্রতিশ্রুতির ঝুলি। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের মধ্যে বড় ঘোষণা—দরিদ্র পরিবারগুলিকে বছরে দু’টি করে এলপিজি সিলিন্ডার দেওয়া হবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, বিশেষত বড়দিন ও ওনামের মতো উৎসবের সময়। এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ভোটারদের কাছে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।

এর পাশাপাশি আরও একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটি পরিবারকে বছরে ২০ হাজার লিটার করে বিনামূল্যে জল সরবরাহ, উন্নত রেলপথ ও মেট্রো পরিষেবার প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার যুগলবন্দি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে বিজেপি।

সবচেয়ে নজরকাড়া পরিকল্পনা হল ‘আরোগ্য সুরক্ষা কার্ড’। দারিদ্রসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলির জন্য প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা রিচার্জ করা হবে এই কার্ডে, যা দিয়ে ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা যাবে। স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনের খরচ কমাতে এই প্রকল্পকে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে গেরুয়া শিবির।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই গোটা ইস্তেহারটি স্পষ্টভাবে ‘ডিরেক্ট বেনিফিট’ মডেলের উপর দাঁড়িয়ে, যা বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের অন্যতম সফল কৌশল হিসেবে ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, বার্ধক্য ভাতা—এই সমস্ত প্রকল্প বাংলায় বিপুল জনসমর্থন এনে দিয়েছে তৃণমূলকে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, একসময় এই ধরনের নগদ সহায়তা ভিত্তিক প্রকল্পকে ‘ফ্রি কালচার’ বা ‘খয়রাতি রাজনীতি’ বলে কটাক্ষ করত বিরোধীরা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। এখন ভোট জিততে গেলে সরাসরি মানুষের হাতে সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার কৌশলই সবচেয়ে কার্যকর—এই সত্য মেনে নিয়েছে প্রায় সব দলই।

বিজেপির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কর্নাটকের ‘লাডলি বেহনা’, মধ্যপ্রদেশের একই নামের প্রকল্প কিংবা মহারাষ্ট্রের ‘মুখ্যমন্ত্রী মাঝি লড়কি বহিন যোজনা’—একাধিক রাজ্যে মহিলাদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে গেরুয়া শিবির। সেই ধারাবাহিকতাতেই এবার কেরলেও একই কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে।

কেরলে বিজেপির এই স্ট্র্যাটেজি শুধু ভোটের অঙ্ক নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তার দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একদিকে যেমন মমতার মডেলের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে, তেমনি অন্যদিকে দেখায় যে, আঞ্চলিক রাজনীতির সফল কৌশল কীভাবে জাতীয় স্তরে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—কেরলের ভোটাররা এই প্রতিশ্রুতিকে কতটা বিশ্বাস করবেন? কারণ, রাজ্যে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস—এই দুই শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে জায়গা করে নেওয়া সহজ নয়। বিজেপির সামনে তাই চ্যালেঞ্জ দ্বিগুণ—একদিকে বিশ্বাসযোগ্যতা, অন্যদিকে সংগঠনের শক্তি।

সব মিলিয়ে, কেরলের নির্বাচনী ইস্তেহারে বিজেপির এই ‘মমতা মডেল’ গ্রহণ নিছক কৌশল নয়, বরং ভারতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন। যেখানে আদর্শ বা মতাদর্শের থেকেও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সরাসরি জনসেবামূলক প্রকল্প ও আর্থিক সহায়তা। আর সেই কারণেই এবারের কেরল নির্বাচন শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার লড়াই নয়—এটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক কৌশল, জনসংযোগ এবং ভোটব্যাঙ্কের নতুন সমীকরণের এক বড় পরীক্ষাক্ষেত্র।

Exit mobile version