আজকের আবহাওয়া নিয়ে বড় সতর্কবার্তা জারি করেছে আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর। বিশেষ করে কলকাতা-সহ গোটা দক্ষিণবঙ্গে আজ বিকেল গড়াতেই তৈরি হতে পারে প্রবল কালবৈশাখীর পরিস্থিতি। আবহাওয়াবিদদের মতে, দিনের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার অস্বাভাবিক ওঠানামার জেরে বিকেলের পর থেকেই বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা বাড়বে, যার ফলস্বরূপ সন্ধ্যার দিকে ঝড়-বৃষ্টি এবং বজ্রবিদ্যুৎ-সহ শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল। এই পরিস্থিতি সাধারণ গ্রীষ্মের দিনের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হতে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আজকের আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, কলকাতা এবং আশপাশের জেলাগুলিতে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার গতিবেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। এই দমকা হাওয়ার সঙ্গে বজ্রপাত এবং মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত মিলিয়ে একেবারে কালবৈশাখীর চেনা রূপ দেখা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কালবৈশাখী মূলত একটি স্থানীয় তীব্র বজ্রঝড়, যা অল্প সময়ের মধ্যেই প্রবল ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম। ফলে শহরবাসী থেকে গ্রামাঞ্চলের মানুষ—সবাইকে আজ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গের মোট ৯টি জেলায় এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই জেলাগুলির মধ্যে রয়েছে হাওড়া, হুগলি, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান এবং নদিয়া। এই অঞ্চলগুলিতে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে আচমকা কালো মেঘ জমে প্রবল ঝড় শুরু হতে পারে। কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, যা ফসল এবং গাছপালার জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে উত্তরবঙ্গেও আবহাওয়া খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। উত্তরবঙ্গ-এর বেশ কয়েকটি জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারের কিছু অংশে আজ বজ্রবিদ্যুৎ-সহ প্রবল বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। ফলে পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজকের এই আবহাওয়ার পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের ওপর একটি নিম্নচাপ বলয় এবং বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাস। এই দুইয়ের সংমিশ্রণে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা বেড়ে গিয়ে কালবৈশাখীর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা জানাচ্ছেন, দিনের বেলায় প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতা জমে থাকার পর বিকেলের দিকে তা হঠাৎ করে মুক্তি পায় ঝড়-বৃষ্টির মাধ্যমে—যা এই ধরনের বজ্রঝড়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
কলকাতার ক্ষেত্রে আজ সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৩২ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে, আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকতে পারে ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রির মধ্যে। তবে দিনের গরমের তুলনায় সন্ধ্যার ঝড়-বৃষ্টির পর আবহাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। তাপমাত্রা সামান্য কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাতাসে আর্দ্রতাও কমতে পারে, ফলে রাতের আবহাওয়া তুলনামূলক আরামদায়ক হবে।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষ কিছু সতর্কতা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় না থাকা, গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি বা ধাতব বস্তু থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ঝোড়ো হাওয়ার কারণে দুর্বল গাছ বা হোর্ডিং ভেঙে পড়ার সম্ভাবনাও থাকে, তাই রাস্তায় চলাচলের সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। গাড়ি চালানোর সময়ও সাবধানে চালাতে হবে, কারণ ঝড়-বৃষ্টিতে দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে।
কৃষিক্ষেত্রেও এই আবহাওয়ার বড় প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা প্রবল। কৃষকদের আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যেমন ফসল ঢেকে রাখা বা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখা। একই সঙ্গে মৎস্যজীবীদেরও সমুদ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ সমুদ্রেও আবহাওয়া খারাপ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে আজকের দিনটি কলকাতা-সহ গোটা পশ্চিমবঙ্গের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সতর্কতামূলক। কালবৈশাখীর সৌন্দর্য যেমন মনোরম, তেমনই এর তীব্রতা বিপজ্জনকও হতে পারে। তাই আবহাওয়ার আপডেটের দিকে নজর রাখা, সরকারি নির্দেশিকা মেনে চলা এবং অপ্রয়োজনীয় বাইরে বেরোনো এড়িয়ে চলাই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় বার্তা। সতর্ক থাকুন, নিরাপদ থাকুন।

