Thu. Mar 19th, 2026

ট্যাটু আজকের দিনে শুধু ফ্যাশন নয়, বরং ব্যক্তিত্ব প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম। কেউ নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত স্মরণে রাখার জন্য ট্যাটু করান, কেউ আবার নিছক ট্রেন্ডের টানে শরীরে কালি আঁকেন। তবে এই জনপ্রিয়তার মাঝেই সামনে আসছে এক নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা নিয়ে চিন্তিত চিকিৎসক মহল। সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, ট্যাটু সাধারণত নিরাপদ হলেও কিছু বিরল ক্ষেত্রে এটি চোখের গুরুতর সমস্যার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে “ইউভাইটিস” নামের এক ধরনের চোখের রোগের সঙ্গে ট্যাটুর সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। তাই ট্যাটু করার আগে শুধু ডিজাইন বা স্টাইল নয়, স্বাস্থ্যের দিকটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবা জরুরি।

প্রথমেই জানা দরকার, ইউভাইটিস আসলে কী। ইউভাইটিস হল চোখের ভেতরের ইউভিয়া অংশে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন। এই অংশটি চোখের রক্ত সরবরাহ ও দৃষ্টিশক্তির স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন এই অংশে প্রদাহ হয়, তখন চোখ লাল হয়ে যাওয়া, তীব্র ব্যথা, ঝাপসা দেখা, আলোতে অস্বস্তি (ফোটোফোবিয়া) এবং চোখের সামনে ভাসমান দাগ (ফ্লোটার) দেখা দেওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়। অনেক সময় রোগী প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না, কিন্তু চিকিৎসা দেরি হলে এই সমস্যা মারাত্মক আকার নিতে পারে এবং স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এখন প্রশ্ন হল, ত্বকে করা একটি ট্যাটু কীভাবে চোখে এমন সমস্যা তৈরি করতে পারে? এর মূল কারণ আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম। ট্যাটু করার সময় সূঁচের মাধ্যমে কালি ত্বকের নিচে প্রবেশ করানো হয়। এই কালি শরীরের কাছে একটি বাইরের বস্তু (foreign substance) হিসেবে চিহ্নিত হয়। ফলে শরীর স্বাভাবিকভাবেই এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই প্রতিক্রিয়া ত্বকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং কোনও বড় সমস্যা হয় না। কিন্তু কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে শরীরের ইমিউন সিস্টেম অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং এই প্রতিক্রিয়া শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন চোখের ভেতরেও প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যার ফলেই ইউভাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দেয়।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, এই সমস্যা ট্যাটু করার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা দেয় না। অনেক সময় দেখা যায়, ট্যাটু করার কয়েক মাস বা এমনকি কয়েক বছর পরেও হঠাৎ করে চোখে সমস্যা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে একসময় গুরুতর আকার নিতে পারে। এই কারণেই বিষয়টি আরও জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ অনেকেই ট্যাটুর সঙ্গে এই সমস্যার সম্পর্ক বুঝতেই পারেন না।

কারা এই ঝুঁকির মধ্যে বেশি পড়তে পারেন, সেটিও জানা জরুরি। যদিও ইউভাইটিস খুবই বিরল, তবুও কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঝুঁকি বাড়তে পারে। যেমন—খুব বড় আকারের ট্যাটু করালে বা শরীরের বড় অংশে কালি ব্যবহার করা হলে শরীরের প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। আবার যাদের আগে থেকেই অটোইমিউন রোগ বা ইমিউন সিস্টেম সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এছাড়া ট্যাটুর কালিতে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক বা ভারী ধাতু দীর্ঘমেয়াদে শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যা পরবর্তীতে চোখের সমস্যার কারণ হতে পারে।

তবে এই বিষয়টি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এমন কেস কিছুটা বেড়েছে বলে চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন। এর একটি বড় কারণ হল, এখন এই বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে এবং চিকিৎসকেরা দ্রুত সমস্যাটি শনাক্ত করতে পারছেন। আগে হয়তো অনেক ক্ষেত্রেই এই সম্পর্কটি ধরা পড়ত না।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল দ্রুত রোগ নির্ণয়। ইউভাইটিসের চিকিৎসা সাধারণত স্টেরয়েড বা অন্যান্য অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি ওষুধের মাধ্যমে করা হয়। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব এবং দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা যায়। কিন্তু দেরি হলে জটিলতা বাড়তে পারে, তাই উপসর্গ দেখা দিলেই অবহেলা না করে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

ট্যাটু করার আগে এবং পরে কিছু সতর্কতা মেনে চললে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। প্রথমত, সবসময় লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ ট্যাটু আর্টিস্টের কাছেই ট্যাটু করানো উচিত। দ্বিতীয়ত, ব্যবহৃত কালি ও যন্ত্রপাতি পরিষ্কার এবং মানসম্মত কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ট্যাটু করার পর শরীরে কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন, বিশেষ করে চোখে সমস্যা দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।

সবশেষে বলা যায়, ট্যাটু মোটের ওপর একটি নিরাপদ প্রক্রিয়া হলেও এর সঙ্গে কিছু বিরল স্বাস্থ্যঝুঁকি জড়িয়ে থাকতে পারে, যা সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাশন বা ব্যক্তিত্ব প্রকাশের তাড়নায় নিজের স্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস করা উচিত নয়। সচেতনতা, সঠিক তথ্য এবং সময়মতো চিকিৎসাই পারে এই ধরনের ঝুঁকি থেকে আপনাকে সুরক্ষিত রাখতে। তাই ট্যাটু করার আগে একবার ভেবে নিন—শুধু স্টাইল নয়, আপনার চোখ ও শরীরের সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

By Sangbad Hate Bazare

“Sangbad Hate Bazare”—”News in the Marketplace”—is more than just a name. It is a commitment to bringing authentic, accessible, and people-centric journalism to the digital streets of Bengal and beyond. Inspired by the ethos of public discourse and open conversation, we present news that’s as diverse and dynamic as the society we serve. Operating under the digital identity “ehatebazare”, our platform is built for the Bengali-speaking global audience. Whether you are in Kolkata, Siliguri, Dhaka, London, or New York, if you speak Bengali, we are your home for news and insights.

Related Post

Leave a Reply