Site icon Sangbad Hate Bazare

ভারতীয় দলে সুযোগ পেয়েও অনিশ্চিত আবরারের ভবিষ্যৎ, অনুমতি দেবে না পাক বোর্ড?

পাকিস্তানের তরুণ লেগস্পিনার আবরার আহমেদকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে৷ ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট দ্য হান্ড্রেড-এ অংশ নেওয়ার জন্য তাঁকে দলে নিয়েছে সানরাইজার্স লিডস, যার মালিকানায় রয়েছেন ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া প্রশাসক কাব্য মারান৷ উল্লেখযোগ্য অঙ্কের পারিশ্রমিকেও চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন এই রহস্যময় স্পিনার৷ কিন্ত্ত সমস্যা তৈরি হয়েছে অন্য জায়গায় – কারণ বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলতে গেলে প্রত্যেক ক্রিকেটারকে নিজ দেশের বোর্ডের কাছ থেকে ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি)’ নিতে হয়, আর সেই অনুমতিই নাকি দিতে অনিচ্ছুক পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড৷ বোর্ড সূত্রে খবর, ইংল্যান্ডে লিগ চলাকালীন সময়েই পাকিস্তান দলের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর নির্ধারিত রয়েছে, যেখানে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলবে পাকিস্তান৷ ফলে জাতীয় দলের পরিকল্পনায় আবরারকে রাখা হলে তিনি লিগে অংশ নিতে পারবেন না৷

অন্যদিকে একই টুর্নামেন্টে পাকিস্তানের আরেক স্পিনার উসমান তারিক দল পেলেও তাঁর ক্ষেত্রে এখনও কোনও বাধা তৈরি হয়নি, তাই প্রশ্ন উঠছে – কেবল আবরারের ক্ষেত্রেই এত দ্বিধা কেন? অনেক ক্রিকেট বিশ্লেষক মনে করছেন, ভারতীয় মালিকানাধীন ফ্র্যাঞ্চাইজিতে তাঁর যোগদানই বিতর্কের মূল কারণ হতে পারে৷ ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে, যেখানে কিছু ব্যবহারকারী #BoycottSunrisers ও #ShameOnSRH হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন৷ তবে দলের কোচ ডেনিয়েল ভিটোরি স্পষ্ট জানিয়েছেন, দলের কৌশলগত পরিকল্পনায় আবরারের স্পিন বোলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাঁর বৈচিত্র্যময় বোলিং ইংল্যান্ডের ব্যাটারদের কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে৷ এখন সব নজর একটাই প্রশ্নে – পাক বোর্ড শেষ পর্যন্ত অনুমতি দেবে, নাকি আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি মঞ্চে আবরারের অভিষেক আপাতত আটকে যাবে৷

২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রাজনীতি যেন নতুন মোড় নিতে শুরু করেছে। বহু বছর ধরে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের উত্তেজনার কারণে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় টি-টোয়েন্টি লিগ আইপিএলসহ বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট থেকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে দূরে রাখা হয়েছিল। রাজনৈতিক উত্তেজনা, সীমান্ত সংঘাত এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব সরাসরি পড়েছিল ক্রিকেটের ময়দানেও। বিশেষ করে গত বছর ভারত-পাক সম্পর্ক আরও অবনতি হওয়ায় দুই দেশের ক্রীড়া সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে সেই পরিস্থিতির মধ্যে নতুন এক সম্ভাবনার আলো দেখা যাচ্ছে। ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে বড় খবর হলো—পাকিস্তানের এক প্রতিভাবান স্পিনারের নাম আবারও ভারতীয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের আলোচনায় উঠে এসেছে, যা অনেকের মতে দীর্ঘদিনের ‘পাকবিরোধী’ মনোভাবের ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গত কয়েক বছর ধরে ভারতীয় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলিতে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। আইপিএলের প্রথম দিকের মৌসুমে যদিও পাকিস্তানের একাধিক তারকা ক্রিকেটার খেলেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সেই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পাকিস্তানের অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার বিশ্বের অন্যতম বড় টি-টোয়েন্টি মঞ্চে নিজেদের দক্ষতা দেখানোর সুযোগ পাননি। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে পাকিস্তানের নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটাররা এখন বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে নজর কাড়ছেন। বিশেষ করে তাদের স্পিন বোলিং শক্তি এবং রহস্যময় ভ্যারিয়েশন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালে ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ ‘দ্য হান্ড্রেড’-এর নিলামকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার ঝড় ওঠে। সেখানে মোট ১৩ জন পাকিস্তানি ক্রিকেটারের নাম তালিকাভুক্ত ছিল। প্রথমদিকে শোনা গিয়েছিল যে ভারতীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি নাকি সেই পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অতীতের রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ক্রীড়া কূটনীতির জটিলতা মাথায় রেখেই অনেকেই এমন সম্ভাবনার কথা বলছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিলামের মঞ্চে ঘটল এক চমকপ্রদ ঘটনা, যা ক্রিকেট বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

নিলামের শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানের রহস্যময় লেগ-স্পিনার আবরার আহমেদের জন্য বিড করতে এগিয়ে আসে একটি ভারতীয় মালিকানাধীন ফ্র্যাঞ্চাইজি। শেষ পর্যন্ত প্রায় ২.৩৪ কোটি ভারতীয় রুপির সমমূল্যে তাকে দলে নেয় কাব্য মারানের মালিকানাধীন দল সানরাইজার্স লিডস। এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে, কারণ দীর্ঘদিন পর কোনও ভারতীয় মালিকানাধীন ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রকাশ্যে একজন পাকিস্তানি ক্রিকেটারের জন্য দর হাঁকাল। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি ট্রান্সফার বা নিলামের ঘটনা নয়; বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলনও হতে পারে।

আবরার আহমেদ বর্তমানে পাকিস্তানের অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল স্পিনার হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার রহস্যময় লেগ-স্পিন, গুগলি এবং বিভিন্ন ভ্যারিয়েশন ইতিমধ্যেই ব্যাটসম্যানদের সমস্যায় ফেলেছে। টেস্ট এবং সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে বিশ্ব ক্রিকেটে দ্রুত পরিচিতি এনে দিয়েছে। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে তার বোলিং স্টাইল অনেক সময় ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করে দেয়। ফলে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে তাকে দলে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন দলের আগ্রহ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক।

ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে স্পিন বোলারদের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে মাঝের ওভারে রান আটকে রাখা এবং উইকেট তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে একজন দক্ষ স্পিনার ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন। আবরার আহমেদের মতো রহস্যময় স্পিনাররা তাই বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠছেন। সানরাইজার্স লিডসের মতো দলও সেই কৌশলগত দিকটি মাথায় রেখেই তাকে দলে নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই ঘটনাকে ঘিরে ক্রিকেট মহলে আরেকটি বড় আলোচনা শুরু হয়েছে—খেলাধুলা কি ধীরে ধীরে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের নতুন সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে? ইতিহাস বলছে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্রিকেট সবসময়ই শুধু খেলা নয়, বরং আবেগ, রাজনীতি এবং কূটনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বড় বিষয়। বহুবার দেখা গেছে যে ক্রিকেটের মাধ্যমে দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাই অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতে যদি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মঞ্চে দুই দেশের ক্রিকেটাররা একসঙ্গে খেলতে শুরু করেন, তবে সেটি ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য বড় আনন্দের বিষয় হবে।

অন্যদিকে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বাস্তবতা অনেকটাই আলাদা। এখানে খেলোয়াড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে জাতীয়তার চেয়ে পারফরম্যান্স এবং বাজারমূল্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি দল যদি মনে করে কোনও ক্রিকেটার তাদের কৌশলগত পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তবে তারা তাকে দলে নিতে আগ্রহী হবে—সে যে দেশেরই হোক না কেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আবরার আহমেদকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ক্রিকেটভিত্তিকও হতে পারে।

যাই হোক, এই ঘটনাটি নিঃসন্দেহে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে নতুন কৌতূহল তৈরি করেছে। বহু বছর পর পাকিস্তানি কোনও ক্রিকেটারকে ভারতীয় মালিকানাধীন ফ্র্যাঞ্চাইজি দলে নেওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, ভবিষ্যতে আরও পাকিস্তানি ক্রিকেটার কি বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে সুযোগ পান এবং দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্ক কি ধীরে ধীরে নতুন পথে এগোয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই নিলাম শুধু একটি খেলোয়াড় কেনাবেচার ঘটনা নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতি, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের ব্যবসায়িক বাস্তবতা এবং খেলাধুলার শক্তির একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ। আবরার আহমেদের এই চুক্তি ভবিষ্যতে ভারত-পাক ক্রিকেট সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে—এমন আশাই করছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা।

Exit mobile version