Tue. Mar 31st, 2026

৮ এপ্রিল বড় শোডাউন! মনোনয়নের দিনেই মাস্টারস্ট্রোক? ভবানীপুরে চূড়ান্ত লড়াইয়ের ইঙ্গিত

ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রকে ঘিরে ক্রমশ চড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ, আর সেই উত্তাপের মধ্যেই সামনে আসছে এক গুরুত্বপূর্ণ খবর—মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগামী ‘৮ এপ্রিল মনোনয়ন জমা দিতে পারেন’, যা এই নির্বাচনী লড়াইয়ে এক বড় মোড় আনতে চলেছে। শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এই দিনটি হতে পারে তৃণমূল কংগ্রেসের শক্তি প্রদর্শনের সূচনা, কারণ কালীঘাটের নিজের বাসভবন থেকেই বিশাল মিছিল করে মনোনয়ন জমা দিতে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।

দক্ষিণ কলকাতার রাজনৈতিক অন্দরমহলের খবর, ওই দিন সকাল থেকেই কালীঘাট এলাকা জমে উঠতে পারে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের ভিড়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের বাড়ি থেকে মিছিল শুরু করে গোপালনগরের সার্ভে বিল্ডিং পর্যন্ত হেঁটে যাবেন বলেই জোর জল্পনা। এই মিছিল শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক যাত্রা নয়—এটি ভোটের আগে জনসংযোগ ও শক্তি প্রদর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, আবেগঘন বার্তা এবং সংগঠনের শক্তি—সবকিছুর মেলবন্ধন ঘটবে এই পদযাত্রায়।

এই মিছিলে কারা কারা উপস্থিত থাকতে পারেন, সেটিও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী, কলকাতার মেয়র ও পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম (ববি), দক্ষিণ কলকাতা তৃণমূল সভাপতি দেবাশিস কুমার—এই সব শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি মিছিলকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। পাশাপাশি ভবানীপুরের সমস্ত তৃণমূল কাউন্সিলরদেরও অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে, যা স্পষ্ট করে দেয় যে, দল এই মনোনয়ন জমা দেওয়াকে একটি বড় রাজনৈতিক ইভেন্ট হিসেবে দেখতে চাইছে।

এবারের ভবানীপুর নির্বাচন এমনিতেই নজরকাড়া, কারণ এখানে মুখোমুখি হচ্ছেন দুই হেভিওয়েট নেতা—তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিজেপির প্রার্থী তথা বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দু একই সঙ্গে নন্দীগ্রাম থেকেও লড়ছেন, আর ২০২১ সালের সেই ঐতিহাসিক নন্দীগ্রাম লড়াইয়ের রেশ এবার ভবানীপুরে নতুন করে ফিরে আসছে। ফলে এই কেন্দ্রটি শুধু রাজ্য নয়, জাতীয় রাজনীতির নজরেও উঠে এসেছে।

এই লড়াইকে আরও ত্রিমুখী করেছে সিপিএম প্রার্থী শ্রীজীব বিশ্বাসের উপস্থিতি। যদিও মূল লড়াই তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা, তবুও বামেদের উপস্থিতি ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে প্রতিটি ভোট, প্রতিটি ওয়ার্ড এবং প্রতিটি প্রচার কর্মসূচি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইতিমধ্যেই শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন এবং মাঠে নেমে পড়েছেন জোর কদমে। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের কেন্দ্রে প্রচার শুরু করেননি। তবে তৃণমূল সূত্রে খবর, মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর থেকেই পূর্ণ মাত্রায় প্রচারে নামবে দল। অর্থাৎ ৮ এপ্রিল শুধু মনোনয়ন নয়, বরং তৃণমূলের নির্বাচনী যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনাও হতে চলেছে।

প্রচারের কৌশল হিসেবে তৃণমূল এবার ওয়ার্ডভিত্তিক পরিকল্পনা নিয়েছে। ভবানীপুরের প্রতিটি এলাকায় আলাদা আলাদা মিছিল, সভা এবং জনসংযোগ কর্মসূচির মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বও মমতার হয়ে প্রচারে নামতে পারেন, যা এই লড়াইকে আরও জমজমাট করে তুলবে।

বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের ওয়ার্ড—৭৩ নম্বর ওয়ার্ডকে। এই ওয়ার্ডকে কেন্দ্র করেই প্রচারের প্রথম ধাপ শুরু করতে চাইছে তৃণমূল। ১৪ এপ্রিল, ড. বি.আর. অম্বেডকরের জন্মদিনে এই ওয়ার্ডে প্রথম বড় সভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সামাজিক বার্তা দেওয়া হবে, তেমনি ভোটারদের সঙ্গে আবেগঘন সংযোগও তৈরি করার চেষ্টা করা হবে।

বর্তমানে ভবানীপুরে তৃণমূলের প্রধান ফোকাস সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা। স্থানীয় নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই ঘরোয়া বৈঠক, বুথ স্তরের প্রস্তুতি এবং কর্মীদের সক্রিয় করার কাজে ব্যস্ত। নির্বাচনের আগে সংগঠনের ভিত মজবুত করাই এখন দলের প্রধান লক্ষ্য, যাতে ভোটের দিন সর্বোচ্চ ফল পাওয়া যায়।

নির্বাচনের সময়সূচিও এই লড়াইকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গে এবার দুই দফায় ভোট অনুষ্ঠিত হবে—২৩ এপ্রিল প্রথম দফা এবং ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফা। ভবানীপুরে ভোট পড়বে দ্বিতীয় দফায়, ফলে প্রচারের জন্য কিছুটা বাড়তি সময় পাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলি। নির্বাচন কমিশন ২ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার বিজ্ঞপ্তি জারি করবে এবং মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৯ এপ্রিল—এই প্রেক্ষাপটে ৮ এপ্রিলের সম্ভাব্য মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরিকল্পনা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কালীঘাট থেকে মিছিল করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোনয়ন জমা দেওয়ার সম্ভাবনা শুধু একটি খবর নয়—এটি ভবানীপুরের নির্বাচনী লড়াইয়ের এক বড় টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক কৌশল, জনসংযোগ, শক্তি প্রদর্শন এবং আবেগ—সবকিছুর সমন্বয়ে এই দিনটি তৃণমূলের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে, আর সেই সঙ্গে ভবানীপুরের ভোটযুদ্ধও প্রবেশ করতে চলেছে এক নতুন, আরও উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায়ে।

Related Post

Leave a Reply