ভারতের জাতীয় সড়কে যাতায়াত আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে ন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (এনএইচএআই)৷ যাত্রীদের সুবিধা ও নিয়মিত হাইওয়ে ব্যবহারকারী ব্যক্তিগত গাড়ি চালকদের কথা মাথায় রেখে গত বছরের আগস্ট মাসে চালু করা হয়েছিল ‘ফাস্টট্যাগ বার্ষিক পাস (FASTag Annual Pass)’৷ এই পাসের মূল উদ্দেশ্য ছিল বারবার টোল ট্যাক্স দেওয়ার ঝামেলা কমানো, সময় বাঁচানো এবং ডিজিটাল টোলিং ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা৷ কিন্ত্ত সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি – বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল এবং আমেরিকার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের উপর পড়ায় তার ঢেউ এসে পৌঁছেছে ভারতেও৷ ফলে পেট্রোল, ডিজেল ও এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়ার পরপরই ফাস্টট্যাগ বার্ষিক পাসের মূল্যও সামান্য বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার৷
## ফাস্টট্যাগ বার্ষিক পাসের নতুন মূল্য কত?
সম্প্রতিন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অফ ইন্ডিয়া-এর পক্ষ থেকে একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয়েছে যে, ‘ফাস্টট্যাগ বার্ষিক পাসের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০৭৫ টাকা’৷ আগে এই পাসের দাম ছিল ৩০০০ টাকা৷ অর্থাৎ এক ধাক্কায় ৭৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে এই বার্ষিক পাসের মূল্য৷ নতুন এই মূল্য কার্যকর হয়েছে চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে৷
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল-এই বাড়তি ফি ‘শুধুমাত্র নন-কমার্শিয়াল বা ব্যক্তিগত গাড়ির জন্যই প্রযোজ্য’৷ অর্থাৎ যেসব গাড়ি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য জাতীয় সড়কে নিয়মিত চলাচল করে, তাদের মালিকদেরই এখন থেকে এই বাড়তি টাকা দিতে হবে৷ বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে এই নির্দিষ্ট বার্ষিক পাসের নিয়ম প্রযোজ্য নয়৷
## কেন চালু করা হয়েছিল ফাস্টট্যাগ বার্ষিক পাস?
ভারতে হাইওয়ে ব্যবস্থাকে আধুনিক করার লক্ষ্যে বেশ কয়েক বছর ধরেই ফাস্টট্যাগ প্রযুক্তি চালু রয়েছে৷ এর মাধ্যমে টোল প্লাজায় গাড়ি থামিয়ে নগদ টাকা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না৷ গাড়ির উইন্ডশিল্ডে লাগানো একটি আরএফআইডি ট্যাগের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল কেটে নেওয়া হয়৷
কিন্ত্ত অনেক গাড়িচালক – বিশেষ করে যারা প্রতিদিন বা প্রায় প্রতিদিন জাতীয় সড়ক ব্যবহার করেন – তাদের জন্য বারবার টোল কাটা বেশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠছিল৷ সেই সমস্যা সমাধানের জন্যই গত বছরের আগস্ট মাসে চালু করা হয় ‘ফাস্টট্যাগ বার্ষিক পাস’৷
এই পাসের মাধ্যমে গাড়িচালকরা এককালীন নির্দিষ্ট টাকা দিয়ে বছরের নির্দিষ্ট সংখ্যক টোল ব্যবহার করতে পারেন৷ ফলে প্রতিবার টোল প্লাজা পার হওয়ার সময় আলাদা করে টোল ট্যাক্স কাটা নিয়ে ভাবতে হয় না৷
## বার্ষিক পাসের মেয়াদ ও ব্যবহার সীমা
ফাস্টট্যাগ বার্ষিক পাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম রয়েছে, যা জানা থাকলে গাড়িচালকদের জন্য এটি আরও সুবিধাজনক হয়ে ওঠে৷
১. বৈধতা :
এই বার্ষিক পাসের মেয়াদ ‘এক বছর’৷ অর্থাৎ পাস সক্রিয় হওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী ১২ মাস পর্যন্ত এটি ব্যবহার করা যাবে৷
২. টোল ব্যবহারের সীমা :
একজন চালক এই পাসের মাধ্যমে সর্বাধিক ‘২০০টি টোল প্লাজা পারাপার করতে পারবেন’৷
৩. সীমা শেষ হলে কী করবেন :
২০০ বার ব্যবহার শেষ হয়ে গেলে আবার পাস রিচার্জ করতে হবে৷
৪. কোথা থেকে রিচার্জ করবেন :
পুনরায় রিচার্জ করা যাবে –
* রাজমার্গ যাত্রা অ্যাপের মাধ্যমে
* অথবা ন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অফ ইন্ডিয়া-এর সরকারি ওয়েবসাইট থেকে৷
## কত মানুষ ব্যবহার করছেন ফাস্টট্যাগ বার্ষিক পাস?
কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে ভারতে ‘৫০ লক্ষেরও বেশি গাড়ির মালিক’ ফাস্টট্যাগ বার্ষিক পাস ব্যবহার করছেন৷ প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ যানবাহন দেশের বিভিন্ন জাতীয় সড়কে চলাচল করে৷ ফলে টোল প্লাজায় যানজট কমানো ও সময় বাঁচানোর ক্ষেত্রে এই পাস একটি বড় ভূমিকা পালন করছে৷
বিশেষ করে যেসব মানুষ প্রতিদিন অফিস, ব্যবসা বা লজিস্টিক কাজে জাতীয় সড়ক ব্যবহার করেন, তাদের কাছে এটি অত্যন্ত সুবিধাজনক একটি ব্যবস্থা৷
## ১ এপ্রিল থেকে টোল প্লাজায় আর নগদ লেনদেন নয়
ফাস্টট্যাগ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ মিনিস্ট্রি অফ রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড হাইওয়েজ-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, ‘আগামী ১ এপ্রিল থেকে দেশের সমস্ত জাতীয় সড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজায় নগদ লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে’৷
অর্থাৎ টোল ট্যাক্স দেওয়ার জন্য তখন থেকে কেবলমাত্র দুইটি ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে –
* ফাস্টট্যাগ
* ইউপিআই (UPI)
৩১ মার্চ পর্যন্ত নগদ লেনদেন চলবে৷ এরপর থেকে সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল টোলিং ব্যবস্থায় চলে যাবে দেশ৷
## কেন চালু হচ্ছে ক্যাশলেস টোলিং?
কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রকের মতে, ‘ক্যাশলেস টোলিং ব্যবস্থা অনেক বেশি দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নির্ভরযোগ্য’৷ এর ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাবে –
#১. যানজট কমবে
টোল প্লাজায় গাড়ি থামিয়ে নগদ লেনদেনের কারণে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়৷ ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই সমস্যা কমবে৷
#২. সময় বাঁচবে
ফাস্টট্যাগ স্ক্যান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি চলে যেতে পারবে৷
#৩. জ্বালানি সাশ্রয় হবে
টোল প্লাজায় দাঁড়িয়ে থাকার সময় গাড়ির জ্বালানি খরচ হয়৷ অপেক্ষার সময় কমলে জ্বালানি খরচও কমবে৷
#৪. দুর্নীতি কমবে
ডিজিটাল লেনদেনের ফলে অর্থের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং মানবিক ত্রুটির সম্ভাবনাও কমবে৷
## ফাস্টট্যাগ কীভাবে কাজ করে?
ফাস্টট্যাগ একটি ‘আরএফআইডি (Radio Frequency Identification)’ প্রযুক্তিনির্ভর স্টিকার, যা গাড়ির সামনে কাচে লাগানো থাকে৷ যখন গাড়ি টোল প্লাজার সেন্সরের কাছে পৌঁছায়, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল ট্যাক্স কেটে নেওয়া হয় ফাস্টট্যাগ অ্যাকাউন্ট থেকে৷
এই অ্যাকাউন্ট সাধারণত যুক্ত থাকে –
* ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
* প্রিপেইড ওয়ালেট
* অথবা ফাস্টট্যাগ ওয়ালেটের সঙ্গে
## বর্তমান জ্বালানির দাম (ভারত – ২০২৬ সালের আনুমানিক গড় মূল্য)
বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে ভারতে জ্বালানির দামও ওঠানামা করছে৷ বর্তমানে বিভিন্ন শহরে গড় হিসেবে –
* পেট্রোল : প্রায় টা.১০৪ – টা.১১০ প্রতি লিটার
* ডিজেল : প্রায় টা.৯২ – টা.৯৮ প্রতি লিটার
* এলপিজি গ্যাস (১৪.২ কেজি সিলিন্ডার) : প্রায় টা.৯০০ – টা.১,০৫০
এই পরিস্থিতিতে পরিবহন খরচ বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে টোল ব্যবস্থাতেও৷
## ফাস্টট্যাগ ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ভারতের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে সরকার ভবিষ্যতে আরও কিছু প্রযুক্তি চালুর পরিকল্পনা করছে৷
সম্ভাব্য উদ্যোগগুলির মধ্যে রয়েছে –
* GPS ভিত্তিক টোল সংগ্রহ ব্যবস্থা
* সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় টোল প্লাজা
* হাইওয়ে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম
* স্মার্ট টোলিং ডেটা অ্যানালিটিক্স
এই প্রযুক্তিগুলি চালু হলে ভবিষ্যতে হয়তো টোল প্লাজায় গাড়ি থামানোর প্রয়োজনই থাকবে না৷
## সাধারণ যাত্রীদের জন্য কী বার্তা?
ফাস্টট্যাগ বার্ষিক পাসের মূল্য বৃদ্ধি খুব বড় অঙ্ক না হলেও এটি হাইওয়ে ব্যবহারকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন৷ বিশেষ করে যারা নিয়মিত জাতীয় সড়কে যাতায়াত করেন, তাদের জন্য এই পাস এখনও অনেক ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী ও সময় বাঁচানো একটি বিকল্প৷
১ মার্চ থেকে নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ায় যারা এখনও পাস নেননি, তারা নতুন রেটে পাস নিতে পারবেন৷ আর ১ এপ্রিল থেকে নগদ লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে ফাস্টট্যাগ বা ইউপিআই ব্যবহার করা প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে৷
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতের হাইওয়ে টোলিং ব্যবস্থা দ্রুত ‘ডিজিটাল, ক্যাশলেস এবং প্রযুক্তিনির্ভর’ হয়ে উঠছে৷ যাত্রীদের সময় বাঁচানো, যানজট কমানো এবং স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য৷

