আধুনিক যুদ্ধের ধরন গত এক দশকে দ্রুত বদলে গেছে, আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ড্রোন প্রযুক্তি৷ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে শুরু করে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র-সব জায়গাতেই মনুষ্যবিহীন বিমান বা ড্রোন এখন কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রগুলোর একটি৷ ইরান, ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার সময় নজরদারি, লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল হামলা এবং সমুদ্রপথে গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার দেখা গেছে৷ একইভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও প্রমাণ করেছে যে তুলনামূলকভাবে কম খরচের ড্রোন কীভাবে প্রচলিত সামরিক কৌশলকে বদলে দিতে পারে৷ যুদ্ধক্ষেত্রে এই ছোট কিন্ত্ত অত্যন্ত কার্যকর প্রযুক্তি বাস্তব-সময়ের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নির্ভুল আক্রমণ পরিচালনা এবং শত্রুর গতিবিধি নজরদারিতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে৷ ফলে সামরিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণেও ড্রোন এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে৷
বিশ্বজুডে় সামরিক কৌশলে ড্রোনের এই বিপ্লবী পরিবর্তন শুধু বড় শক্তিগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দক্ষিণ এশিয়াতেও এর প্রভাব স্পষ্ট৷ ভারত ক্রমশই পাকিস্তান এবং চীনের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে এবং অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ড্রোন ব্যবহারের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে৷ সীমান্তে সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি আকাশপথে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি এখন নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ৷ পাহাডি় অঞ্চল, মরুভূমি কিংবা দুর্গম সীমান্ত এলাকায় যেখানে মানুষের উপস্থিতি সবসময় সম্ভব নয়, সেখানে ড্রোন দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে সেনাবাহিনীকে সহায়তা করছে৷ শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, দুর্যোগ মোকাবিলা, সমুদ্র নজরদারি, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং বাণিজ্যিক কাজে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে৷ এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিশ্বব্যাপী নতুন নতুন উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করছে, এবং বহু দেশ নিজেদের ড্রোন প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে৷
এই উদ্ভাবনের দৌড়ে ভারতের প্রযুক্তি শহর বেঙ্গালুরু আবারও নজর কেডে়ছে৷ ‘স্টার্টআপ ক্যাপিটাল অফ ইন্ডিয়া’ নামে পরিচিত এই শহরে তরুণ উদ্যোক্তারা নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন৷ সেই ধারাবাহিকতায় বেঙ্গালুরুর একটি তরুণ স্টার্টআপ অ্যাকোয়াএয়ারএক্স এমন একটি অভিনব ড্রোন তৈরি করেছে, যা আকাশে উড়তে পারে আবার জলের নিচেও কাজ করতে সক্ষম৷ ভারতের ড্রোন প্রযুক্তিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে৷ এই স্টার্টআপটির প্রতিষ্ঠাতা দুই তরুণ প্রকৌশলী, যারা নিত্তে মীনাক্ষী ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে পড়াশোনা করার সময় থেকেই স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন একটি ড্রোন তৈরির, যা একইসঙ্গে আকাশ এবং জলের নিচে কাজ করতে পারে৷
অ্যাকোয়াএয়ারএক্সের তৈরি এই অভিনব ড্রোনটির নাম রাখা হয়েছে ‘অবতার’৷ এটি একটি উভচর ড্রোন প্ল্যাটফর্ম, যার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো-এটি আকাশে উড়তে পারে, জলে অবতরণ করতে পারে, তারপর জলের নিচে ডুব দিয়ে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে আবার জলের উপর থেকে উডে় আকাশে ফিরে যেতে পারে৷ অর্থাৎ একই যন্ত্রের মাধ্যমে দুই ভিন্ন পরিবেশে-বায়ু এবং জল-মিশন পরিচালনা করা সম্ভব৷ প্রতিষ্ঠাতাদের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মানবহীন সিস্টেমের সক্ষমতাকে অনেকটাই বাড়িয়ে দিতে পারে৷ বিশেষ করে সমুদ্র নজরদারি, সাবমেরিন পর্যবেক্ষণ, উদ্ধার অভিযান বা সামুদ্রিক গবেষণার ক্ষেত্রে এই ধরনের ড্রোন অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে৷
অবতার ড্রোনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর পেলোড ক্ষমতা৷ এটি প্রায় ১০ কেজি পর্যন্ত পেলোড বহন করতে সক্ষম, যা নজরদারি যন্ত্র, সেন্সর বা বিশেষ ক্যামেরা বহনের জন্য যথেষ্ট৷ এই ড্রোনটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে এটি আকাশ থেকে উডে় গিয়ে সমুদ্রে ডুব দিতে পারে এবং সেখান থেকে লক্ষ্যবস্তু পর্যবেক্ষণ বা নির্দিষ্ট মিশন সম্পন্ন করার পর আবার আকাশে উডে় ফিরে আসতে পারে৷ সামরিক ক্ষেত্রে এটি উপকূলীয় নিরাপত্তা, শত্রু জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং গোপন নজরদারিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে৷ একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও যেমন অফশোর তেল ও গ্যাস স্থাপনা পর্যবেক্ষণ, সমুদ্রের নিচে অবকাঠামো পরীক্ষা বা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই প্রযুক্তি অত্যন্ত উপযোগী হতে পারে৷
ড্রোন প্রযুক্তির এই নতুন ধারণা বাস্তবায়নের জন্য স্টার্টআপটি ইতিমধ্যেই একাধিক পরীক্ষামূলক ধাপ সম্পন্ন করেছে৷ প্রথমে পুল ট্রায়ালের মাধ্যমে ড্রোনটির জলে অবতরণ, ডুব দেওয়া এবং পুনরায় উপরে ওঠার সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়৷ এরপর স্বাধীন প্ল্যাটফর্মে পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হয়েছে যে এটি আকাশ এবং জলের মধ্যে সহজে স্থানান্তর করতে পারে কি না৷ এই পরীক্ষাগুলির ফল ইতিবাচক হওয়ায় গবেষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়েছে৷ বর্তমানে উন্নত পর্যায়ের আকাশ পরীক্ষা এবং খোলা সমুদ্রে পরীক্ষাও চলছে, যা সফল হলে এটি ভারতের প্রথম কার্যকর উভচর ড্রোন হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে৷
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে যুদ্ধক্ষেত্র এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এমন বহুমুখী ড্রোনের গুরুত্ব আরও বাড়বে৷ কারণ আধুনিক সংঘাতে তথ্য সংগ্রহ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং কম খরচে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে৷ একসময় যুদ্ধের জন্য বড় আকারের যুদ্ধবিমান বা জাহাজের উপর নির্ভর করতে হতো, কিন্ত্ত এখন ছোট, দ্রুত এবং অত্যাধুনিক ড্রোন সেই কাজ অনেক ক্ষেত্রে আরও দক্ষতার সঙ্গে করতে পারছে৷ ফলে প্রযুক্তি-নির্ভর এই যুদ্ধ কৌশলে যে দেশ যত দ্রুত নতুন উদ্ভাবন করতে পারবে, তার সামরিক ও কৌশলগত শক্তি তত বেশি বাড়বে৷
ভারতের মতো প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ এবং দ্রুত বিকাশমান দেশে স্টার্টআপদের এই ধরনের উদ্ভাবন শুধু প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে৷ বেঙ্গালুরুর অ্যাকোয়াএয়ারএক্সের তৈরি ‘অবতার’ ড্রোন সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ৷ যদি ভবিষ্যতের পরীক্ষাগুলো সফল হয় এবং এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হতে শুরু করে, তবে ভারত ড্রোন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে৷ একই সঙ্গে এই উদ্ভাবন প্রমাণ করে যে তরুণ প্রকৌশলী ও স্টার্টআপ উদ্যোগের মাধ্যমে ভারত এখন শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নয়, বরং প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠছে৷

