বাংলার রাজনৈতিক মহলে ফের জোর জল্পনা, আর সেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন বামপন্থী যুবনেতা সৃজন ভট্টাচার্য। আসন্ন West Bengal Assembly Election 2026-কে সামনে রেখে যখন Communist Party of India (Marxist) তথা বামফ্রন্ট প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে, তখনই চোখে পড়ে এক বড় অনুপস্থিতি—সেই তালিকায় নেই সৃজনের নাম। যাদবপুর তো দূরের কথা, এখনও পর্যন্ত কোনও কেন্দ্রেই তাঁকে প্রার্থী করা হয়নি। আর এই ঘটনাতেই রাজনৈতিক অন্দরে শুরু হয়েছে তুমুল জল্পনা—তাহলে কি সদ্য দলবদল করা প্রতীক উর রহমান-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই সৃজনের টিকিট না পাওয়ার কারণ? নাকি এর পেছনে রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ?
প্রসঙ্গত, প্রতীক উর রহমান এবং সৃজন ভট্টাচার্যের বন্ধুত্ব শুধু রাজনৈতিক মঞ্চেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ব্যক্তিগত সম্পর্কেও তা ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। একাধিক আন্দোলন, মিটিং-মিছিল—সব জায়গাতেই এই দুই তরুণ মুখকে একসঙ্গে দেখা গিয়েছে। এমনকি সৃজন প্রকাশ্যেই প্রতীককে ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতেন, যা তাঁদের সম্পর্কের গভীরতাকে স্পষ্ট করে। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই সমীকরণে ছন্দপতন ঘটে, যখন প্রতীক উর বাম শিবির ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস-এ যোগ দেন। তাঁর এই দলবদল রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে বড় চমক সৃষ্টি করে এবং সেই সময় থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—সৃজনও কি একই পথে হাঁটবেন?
এই জল্পনা আরও জোরদার হয় যখন প্রতীকের দলত্যাগের পর সৃজনের প্রতিক্রিয়ায় আবেগের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেকেই মনে করেছিলেন, এত ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দলত্যাগ সৃজনকে প্রভাবিত করতে পারে। এমনকি রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা ছিল, হয়তো তিনিও শিগগিরই দল বদল করতে পারেন। কিন্তু সেই সব জল্পনায় বারবার জল ঢেলেছেন সৃজন নিজেই। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি আদর্শগতভাবে বামপন্থায় বিশ্বাসী এবং এই পথ ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাঁর মতে, রাজনীতি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপর নির্ভর করে না, বরং তা আদর্শ ও বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকে।
তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি তিনি দলেই থাকেন, তাহলে প্রার্থী তালিকায় তাঁর নাম নেই কেন? এই প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন সৃজন ভট্টাচার্য নিজেই। তাঁর কথায়, “সবাইকে প্রার্থী হতে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। সংগঠন আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, সেটাই আমি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব।” তিনি আরও জানান, নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য পূর্ণ সময় দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর তিনি বর্তমানে সংগঠনের কাজে এতটাই ব্যস্ত যে সেই সময় দেওয়া সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, তিনি বর্তমানে Students’ Federation of India (এসএফআই)-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, যা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ। ফলে রাজ্য জুড়ে সাংগঠনিক কাজের চাপই তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার।
সূত্রের খবর, প্রায় দুই থেকে তিন মাস আগেই তিনি দলের রাজ্য নেতৃত্বকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি এই নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী নন। তাঁর যুক্তি, আংশিক সময় দিয়ে নির্বাচনে লড়া অনৈতিক এবং এতে দল বা ভোটারদের সঙ্গে সুবিচার করা হয় না। এই বক্তব্য অনেকের কাছেই একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে ধরা পড়েছে। কারণ, বর্তমান রাজনীতিতে যেখানে প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র, সেখানে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানো একপ্রকার বিরল ঘটনা।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বিষয়টি এত সরল নয়। প্রতীক উর রহমানের দলবদল এবং তার প্রভাব সৃজনের উপর কতটা পড়েছে, তা নিয়ে এখনও নানা মহলে আলোচনা চলছে। যদিও প্রকাশ্যে সৃজন কোনও বিতর্কে জড়াতে চাননি, তবুও তাঁর নাম প্রার্থী তালিকায় না থাকায় সেই পুরনো জল্পনাই আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যাদবপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে তাঁকে প্রার্থী করা হতে পারে বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, তা ভেস্তে যাওয়ায় প্রশ্ন আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে, বামফ্রন্ট এবার তরুণ ও নতুন মুখকে সামনে এনে ভোটের ময়দানে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে চাইছে। সেই প্রেক্ষাপটে সৃজনের মতো একজন জনপ্রিয় যুবনেতার অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে চোখে পড়ার মতো। তবে তিনি নিজে যেভাবে দলের প্রতি আনুগত্য এবং আদর্শের প্রতি বিশ্বাসের কথা বারবার তুলে ধরেছেন, তাতে স্পষ্ট যে তিনি আপাতত সংগঠনের কাজেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য, তাঁকে যে দায়িত্বই দেওয়া হোক না কেন, তিনি সর্বশক্তি দিয়ে বামপন্থী প্রার্থীদের জেতানোর চেষ্টা করবেন।
সব মিলিয়ে, সৃজন ভট্টাচার্যকে ঘিরে এই জল্পনা বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি শুধু একজন নেতার প্রার্থী হওয়া বা না হওয়ার প্রশ্ন নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আদর্শ, সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক কৌশলের জটিল সমীকরণ। আগামী দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত এতটুকু স্পষ্ট—সৃজন ভট্টাচার্য এখনও বাম রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ, এবং তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপই নজরে রাখছে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষ।

