১৩ বছরের দীর্ঘ যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এক ঐতিহাসিক আইনি সিদ্ধান্তে মুক্তির পথে এগোলেন হরিশ রানা৷ সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট অফ ইন্ডিয়া তাঁর ক্ষেত্রে প্যাসিভ ইউথানেশিয়া বা স্বেচ্ছা মরণের অনুমতি দিয়ে এমন একটি নজিরবিহীন রায় দিয়েছে, যা ভারতের বিচারব্যবস্থায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে৷ ২০১৩ সালে পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মেধাবী ছাত্র ছিলেন হরিশ৷ সেই সময় তিনি মোহালির একটি পেইং গেস্ট আবাসনে থাকতেন৷ দুর্ভাগ্যজনকভাবে একদিন ভবনের চতুর্থ তলা থেকে পডে় গুরুতর দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি৷ সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মাথায় মারাত্মক আঘাত লাগে এবং এরপর থেকেই তিনি গভীর অচেতন অবস্থায় চলে যান৷ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি এক ধরনের স্থায়ী ভেজিটেটিভ স্টেট, যেখানে শরীরের মৌলিক কার্যকলাপ যেমন শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে থাকলেও ব্যক্তি সচেতনভাবে কোনো অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন না৷
দুর্ঘটনার পর থেকে গত ১৩ বছর ধরে হরিশ রানা প্রায় সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় শয্যাশায়ী৷ তিনি কাউকে চিনতে পারেন না, কথা বলতে পারেন না, এমনকি নিজের শরীরের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই৷ এত দীর্ঘ সময় ধরে তাকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমের মাধ্যমে৷ এই সময়ে তাঁর বাবা-মা অসীম ধৈর্য্য ও আশায় অপেক্ষা করেছেন – হয়তো একদিন তাদের ছেলে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে৷ কিন্ত্ত বছরের পর বছর কেটে গেলেও চিকিৎসায় কোনো উন্নতির লক্ষণ দেখা যায়নি৷ শেষ পর্যন্ত সন্তানকে অনন্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য তারা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন৷
বর্তমানে দিল্লির কাছের গাজিয়াবাদে নিজের বাডি়তেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন ৩১ বছর বয়সী হরিশ৷ তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে একসময় তিনি ছিলেন সুদর্শন, প্রাণবন্ত এবং খেলাধুলায় পারদর্শী এক তরুণ৷ তাঁর চোখ খোলা থাকলেও সেখানে কোনো সাড়া বা অনুভূতির প্রতিফলন নেই৷ শ্বাস নিতে হয় ট্র্যাকিওস্টোমি টিউবের সাহায্যে, আর খাবার দেওয়া হয় একটি বিশেষ ফিডিং টিউবের মাধ্যমে৷ প্রতিদিন তাকে প্রোটিন শেক এবং তরল খাবার দেওয়া হয়, এমনকি চূর্ণ করা ডাল ছেঁকে সেই টিউব দিয়ে শরীরে প্রবেশ করানো হয়৷ দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে শুয়ে থাকার কারণে বেডসোর বা ঘা যেন না বাডে়, সে জন্য প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর তাঁর শরীরের অবস্থান বদলাতে হয়৷ এই দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়া শুধু শারীরিক কষ্টই নয়, মানসিক ও আর্থিক দিক থেকেও পরিবারের জন্য এক কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছিল৷
এই প্রেক্ষাপটে মামলাটি শুনানি করে সুপ্রিম কোর্ট অফ ইন্ডিয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে৷ আদালত জানায় – শুধু হূদস্পন্দন থাকলেই তাকে পূর্ণ জীবন বলা যায় না; মানুষের জীবনের মর্যাদা ও মানবিকতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ৷ বিচারপতিরা মনে করেন, যখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আর কোনো উন্নতির সম্ভাবনা নেই এবং রোগী দীর্ঘদিন ধরে অচেতন অবস্থায় কষ্টের মধ্যে রয়েছেন, তখন পরিবারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়াও মানবিকতার অংশ৷ সেই বিবেচনায় আদালত হরিশ রানার লাইফ সাপোর্ট ধীরে-ধীরে বন্ধ করার অনুমতি দেয়, যাতে তিনি দীর্ঘ ও নিঃসাড় যন্ত্রণার জীবন থেকে মুক্তি পান৷ এই প্রক্রিয়াটিই চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্যাসিভ ইউথানেশিয়া নামে পরিচিত৷
ভারতের আইন ও মানবাধিকারের আলোচনায় প্যাসিভ ইউথানেশিয়া বিষয়টি বহু বছর ধরেই বিতর্কিত৷ তবে হরিশ রানার মামলার রায়ে আদালত শুধু একটি ব্যক্তিগত আবেদন মঞ্জুর করেনি, বরং বৃহত্তর আইনি কাঠামোর দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে৷ আদালত কেন্দ্র সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে – প্যাসিভ ইউথানেশিয়া সংক্রান্ত একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর আইন প্রণয়নের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে৷ এতে ভবিষ্যতে এ ধরনের জটিল মানবিক পরিস্থিতিতে পরিবার, চিকিৎসক এবং প্রশাসনের জন্য পরিষ্কার নির্দেশিকা তৈরি হবে৷
এই রায় শুধু একটি পরিবারের দীর্ঘ যন্ত্রণার অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নয়, বরং মানবিক মর্যাদা, চিকিৎসা নৈতিকতা এবং বিচারব্যবস্থার সংবেদনশীলতার এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ৷ হরিশ রানার ঘটনাটি এখন ভারতের আইনি ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যেখানে আদালত মানবিকতার প্রশ্নকে আইনের সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে ইউথানেশিয়া নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা শুরু করতে পারে এবং চিকিৎসা-নৈতিকতার নতুন দিক উন্মোচন করবে৷
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় – জীবন শুধু অস্তিত্বের প্রশ্ন নয়, তার সঙ্গে জডি়য়ে থাকে মর্যাদা, মানবিকতা এবং কষ্ট থেকে মুক্তির অধিকারও৷ হরিশ রানার দীর্ঘ ১৩ বছরের নীরব সংগ্রাম তাই এখন ভারতের বিচারব্যবস্থায় এক গভীর মানবিক অধ্যায় হয়ে রইল৷

