ক্লাস্টার বোমা (Cluster Bomb) এমন এক ধরনের বিশেষ মারণাস্ত্র, যা একটি বড় কন্টেইনার বা শেলের মধ্যে থাকে৷ এটিকে আকাশ থেকেও ফেলা যায় কিংবা মাটি থেকেও ছোঁড়া হয়, এটি মাঝ-আকাশে ফাটে এবং শেলের ভেতর থেকে শতাধিক ছোট ছোট বোমা (যাকে ‘সাবমিউনিশন’ বা ‘বমলেট’ বলা হয়) চারদিকে ছড়িয়ে যায়৷ ১৯৪৩ সালে জার্মানি এই বোম প্রথম তৈরী করেছিল, পরবর্তী সময়ে রাশিয়া আর আমেরিকা ও তৈরী করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যাপকহারে ব্যবহার করা হয়৷ একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বড় ধরনের ধ্বংসলীলা চালানোর জন্য এটি ব্যবহার করা হয়৷ একটি বড় বোমা ফেটে যাওয়ার পর ছোট বমলেটগুলো ফুটবল মাঠের সমান বা তার চেয়েও বড় এলাকায় বৃষ্টির ফোঁটার মতো ছড়িয়ে পড়ে৷ এটি মূলত শত্রুঘাঁটি, সাঁজোয়া যান বা সৈন্যদলের বড় জমায়েত ধ্বংস করতে ব্যবহূত হয়৷
জানেন ক্লাস্টার বোমার ভয়াবহতা? এই বোমার লক্ষ্য শুধুই তাৎক্ষণিক ক্ষতিসাধন নয়, দীর্ঘ সময় ধরে বিপদজনক৷ এটি কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে না বদলে বিশাল এলাকা জুড়ে চালায় ধ্বংসলীলা৷ জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ক্লাস্টার বোমার ব্যবহার সাধারণ মানুষের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ৷ ক্লাস্টার বোমার সবচেয়ে বড় সমস্যা, অনেক সময় ১০% থেকে ৪০% ছোট ‘বমলেট’গুলি তাৎক্ষণিকভাবে ফাটে না৷ এগুলো বছরের পর বছর মাটির নীচে বা ঝোপঝাড়ের মধ্যে ল্যান্ডমাইন বা মাইনের মতো পড়ে থাকে৷ যুদ্ধ শেষ হওয়ার অনেক পরেও সাধারণ মানুষ বা শিশুরা খেলার সময় ভুলবশত এগুলো স্পর্শ করলে বিস্ফোরণ ঘটে মৃতু্য বা পঙ্গুত্বের শিকার হয়৷
১৯৬০ দশক জুড়ে আমেরিকা- ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এবং লাওস জুড়ে কোটি কোটি ক্লাস্টার বোমা (বিএলইউ -২৬) নিক্ষেপ করা হয়েছিল৷ এখনো ভুগছে এখানকার বাসিন্দারা৷ এই বোমার ভয়ে মাইলের পর মাইল চাষ যোগ্য জমিতে এখনও চাষ করা সম্ভব হয়নি৷ বিপদজনক স্থান চিহ্নিত করে ফেলে রাখা হয়েছে, অহরহ দুর্ঘটনা ঘটে৷ সম্প্রতি কিছু আফ্রিকান ইঁদুরদের ট্রেনিং দিয়ে এই ছড়িয়ে থাকা বোমা উদ্ধার করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে৷ মনে করা হয় এখনো পর্যন্ত ২৩০০০ মানুষের মৃতু্য হয়েছে এবং লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত৷ বর্তমান সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক যুদ্ধে ক্লাস্টার বোমার ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্ক চলছে৷
এই অস্ত্রের ভয়াবহতার কারণে ২০০৮ সালে ওসলোতে‘কনভেনশন অন ক্লাসটার মিউনিশন’ নামে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়৷ বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশ এই বোমা উৎপাদন, ব্যবহার এবং মজুত নিষিদ্ধ করতে রাজি হয়েছে৷ কিন্ত্ত ভাবনার বিষয়; বিশ্বের প্রধান সামরিক শক্তিধর দেশগুলি (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত, ইউক্রেন) এখনো এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি৷
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ল্যান্ড মাইনের মতোই নিষিদ্ধ ক্লাস্টার বোমা!

